কলকাতার দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হতেই শহরের দুই বহুল আলোচিত পুজো কমিটি বড় ঘোষণা করল। খুঁটিপুজোর মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালের আয়োজনের সূচনা করে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার ও শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব এবারের ভাবনা প্রকাশ করেছে। একদিকে ইতিহাস ও দেশাত্মবোধের বার্তা, অন্যদিকে সর্বজনীন অংশগ্রহণ ও মাতৃ আরাধনার ওপর জোর—দুই পুজোই এবার ভিন্ন দর্শন নিয়ে দর্শকদের সামনে আসতে চলেছে।
৯১তম বর্ষে ‘বন্দেমাতরম’ থিমে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার
এবার ৯১ বছরে পা দিল সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের দুর্গাপুজো। খুঁটিপুজোর অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তারা জানান, ২০২৬ সালের থিম ‘বন্দেমাতরম’।
কমিটির দাবি, ‘বন্দেমাতরম’ গানের ১৫০ বছর পূর্তি এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবর্ষকে স্মরণ করেই এই থিম নির্বাচন করা হয়েছে। দেশাত্মবোধ, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই এবারের মণ্ডপ ও উপস্থাপনা সাজানো হবে।
থাকছে না লেজার শো, তবুও বড় চমকের আশ্বাস
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অত্যাধুনিক লেজার শো এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা। তবে এবার সেই ধারা থেকে সরে আসছে পুজো কমিটি।
উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনের বদলে শিল্পভাবনা, মণ্ডপসজ্জা এবং থিম উপস্থাপনাতেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। ফলে দর্শনার্থীরা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা পাবেন বলেই তাঁদের আশা।
সজল ঘোষের বার্তা
পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা সজল ঘোষ এদিন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, এবারের আয়োজন দর্শকদের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যাবে।
তিনি বলেন, “এবারের পুজো অবশ্যই দেখতে হবে। না দেখলে সারা বছর আফসোস করতে হবে।”
তাঁর মতে, প্রতিটি অংশেই থাকবে নতুনত্ব, যা দর্শকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করবে।
প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে আশাবাদ
অনুষ্ঠানে উপস্থিত তাপস রায়ও পুজো পরিচালনা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখেই সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হবে।
একই সঙ্গে অতীতে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে মণ্ডপে প্রবেশ করানোর মতো পরিস্থিতির প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর আশা, এবার সেই ধরনের সমস্যা তৈরি হবে না।
নতুন পথে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব
অন্যদিকে, উত্তর কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় পুজো শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবও এবারে নতুন ভাবনার কথা জানিয়েছে।
কমিটির সভাপতি কনক দেবনাথ জানান, এবারের দুর্গাপুজোয় কোনও ব্যক্তি বিশেষকে কেন্দ্র করে প্রচার নয়, বরং মা দুর্গার আরাধনা এবং ক্লাবের সদস্য ও এলাকার মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তাঁর বক্তব্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে পুজো আরও সর্বজনীন রূপ পাবে।
মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ
এবারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো, খুঁটিপুজোর সূচনায় এলাকার মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।
কমিটির দাবি, ভবিষ্যতেও পুজোর বিভিন্ন আয়োজন ও পরিচালনায় মহিলাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো হবে। এতে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাবে বলেই তাঁদের বিশ্বাস।
দর্শনার্থীদের সুবিধাকেও গুরুত্ব
শুধু থিম বা মণ্ডপসজ্জা নয়, দর্শনার্থীদের সুবিধা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন যাতে ব্যাহত না হয়, সেই দিকেও নজর দিচ্ছে শ্রীভূমি কর্তৃপক্ষ।
যান চলাচল, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং পুজোর সময় এলাকাবাসীর অসুবিধা কমানোর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে কমিটির তরফে জানানো হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এবারের ঘোষণা?
কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ইউনেস্কো স্বীকৃত এক আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তাই শহরের বড় পুজোগুলির থিম, শিল্পভাবনা এবং আয়োজন প্রতি বছরই দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
২০২৬ সালের শুরুতেই সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার এবং শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের এই ঘোষণায় স্পষ্ট, দুই পুজোই আলাদা দর্শন নিয়ে এগোতে চাইছে। একদিকে ইতিহাস ও দেশাত্মবোধের বার্তা, অন্যদিকে সর্বজনীন অংশগ্রহণ ও মাতৃ আরাধনার উপর জোর—এই দুই ভাবনার মেলবন্ধনই এবারের দুর্গাপুজোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
উল্লেখ্য, সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ঘুরে বেড়ালেও, পুজো কমিটিগুলির আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় মূলত থিম, আয়োজন এবং পরিচালনাগত পরিবর্তনের বিষয়েই জোর দেওয়া হয়েছে। তাই এ সংক্রান্ত অন্য কোনও রাজনৈতিক দাবি বা ব্যাখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।



