মোবাইলে ইন্টারনেট নেই, সেলুলার নেটওয়ার্কও অচল—তবু এক ফোন থেকে অন্য ফোনে পৌঁছে যাচ্ছে বার্তা। শুনতে অবাক লাগলেও, আধুনিক ওয়্যারলেস প্রযুক্তির সাহায্যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এমন যোগাযোগ সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিক্ষোভ, দুর্যোগ বা নেটওয়ার্ক বিভ্রাটের প্রসঙ্গে Mesh Networking এবং Bluetooth Low Energy (BLE) প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এই প্রযুক্তি কোনও নির্দিষ্ট সংগঠন বা আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ নয়। জরুরি যোগাযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ক্যাম্পিং, বড় জনসমাগম কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকলেও সীমিত পরিসরে বার্তা আদান-প্রদানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
Mesh Networking কী?
Mesh Networking এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি স্মার্টফোন বা ডিভাইস একটি ছোট নেটওয়ার্ক নোড হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কে বার্তা পাঠাতে টেলিকম টাওয়ার বা ইন্টারনেট সার্ভারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু Mesh Network-এ কাছাকাছি থাকা একাধিক ডিভাইস নিজেদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।
Bluetooth Low Energy (BLE) কীভাবে সাহায্য করে?
এই ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো Bluetooth Low Energy (BLE)।
BLE-এর মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা দুটি ডিভাইস খুব কম বিদ্যুৎ খরচে সংযুক্ত হতে পারে। এরপর একটি ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে বার্তা পাঠানো সম্ভব হয়।
যদি নেটওয়ার্কে একাধিক ব্যবহারকারী যুক্ত থাকেন, তাহলে বার্তাটি এক ডিভাইস থেকে আরেক ডিভাইসে পর্যায়ক্রমে পৌঁছাতে পারে।
কীভাবে কাজ করে এই “হপ-বাই-হপ” পদ্ধতি?
ধরা যাক—
- ব্যক্তি A একটি বার্তা পাঠালেন।
- তাঁর কাছাকাছি থাকা B-এর ফোন সেটি গ্রহণ করল।
- এরপর B সেই বার্তাটি C-এর ফোনে পাঠিয়ে দিল।
- একইভাবে বার্তাটি পরবর্তী ডিভাইসগুলিতে পৌঁছাতে থাকে।
এই পদ্ধতিকেই সাধারণভাবে Hop-by-Hop Relay বলা হয়।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ছাড়াই নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কী?
যদিও প্রযুক্তিটি আকর্ষণীয়, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
- Bluetooth-এর সীমিত কার্যকর দূরত্ব।
- পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্যবহারকারী না থাকলে নেটওয়ার্ক ভেঙে যেতে পারে।
- বড় আকারের ফাইল পাঠানো সাধারণত সহজ নয়।
- এটি মোবাইল ইন্টারনেটের বিকল্প নয়; বরং সীমিত পরিস্থিতির জন্য একটি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা।
কোথায় কোথায় ব্যবহার হয়েছে?
Mesh Networking কোনও নতুন প্রযুক্তি নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ইন্টারনেট বিভ্রাট এবং কিছু গণবিক্ষোভের সময় অফলাইন যোগাযোগের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হওয়ার খবর অতীতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার ধরন, ব্যবহৃত অ্যাপ এবং প্রযুক্তিগত কাঠামো এক নয়।
নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা
অনেক অফলাইন মেসেজিং অ্যাপে বার্তাগুলি এনক্রিপ্টেড থাকে, যার ফলে অননুমোদিত ব্যক্তির পক্ষে বার্তার বিষয়বস্তু পড়া কঠিন হতে পারে।
তবে কোনও প্রযুক্তিই শতভাগ নিরাপদ নয়। ব্যবহৃত অ্যাপ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীর আচরণের উপর গোপনীয়তার মাত্রা নির্ভর করে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার জন্য কী চ্যালেঞ্জ?
যেহেতু এই ধরনের যোগাযোগে অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক বা কেন্দ্রীয় সার্ভারের উপর নির্ভর করতে হয় না, তাই তদন্তের পদ্ধতিও ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি সিসিটিভি ফুটেজ, ডিভাইস ফরেনসিক, লোকেশন বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহার করে তদন্ত চালিয়ে থাকে। তবে নির্দিষ্ট কোনও ঘটনার তদন্ত সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস।
ভবিষ্যতে কেন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই প্রযুক্তি?
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নেটওয়ার্ক বিভ্রাট, পাহাড়ি এলাকা বা বড় জনসমাগমের মতো পরিস্থিতিতে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে Mesh Networking প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে।
তবে এটি এখনও প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেটের পূর্ণ বিকল্প নয়। বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ সচল রাখার একটি কার্যকর প্রযুক্তিগত সমাধান হিসেবেই একে দেখা হয়।



