গজানন গণেশকে সনাতন ধর্মে প্রথম পূজ্য দেবতা হিসেবে মানা হয়। নতুন কাজ শুরু হোক, বিদ্যাচর্চা, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনও শুভ উদ্যোগ—বিঘ্নহর্তা গণপতির স্মরণ করার রীতি বহুদিনের। ভক্তদের বিশ্বাস, তাঁর আরাধনায় জীবনের বাধা দূর হয় এবং জ্ঞান, সিদ্ধি ও সমৃদ্ধির আশীর্বাদ মেলে।
প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে পালিত হয় গণেশ চতুর্থী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই উৎসবের রীতি আলাদা হলেও গণপতি স্থাপন, পুজো, প্রসাদ নিবেদন এবং ভক্তিভরে আরাধনা—সবই এই উৎসবের মূল অঙ্গ।
তবে ২০২৬ সালের গণেশ চতুর্থী নিয়ে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। এ বছর গণেশ চতুর্থী পড়ছে সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। চতুর্থী তিথি শুরু হবে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৬ মিনিটে এবং শেষ হবে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৪৪ মিনিটে।
গণেশ চতুর্থী ২০২৬-এ গণপতি স্থাপনের শুভ সময় কখন?
গণেশ চতুর্থীর পুজোর ক্ষেত্রে মধ্যাহ্নকালকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রচলিত পঞ্জিকা-ভিত্তিক গণনায় এই সময়েই গণপতি স্থাপন ও মূল পুজো করার রীতি রয়েছে। তবে শুভ সময় শহরভেদে কয়েক মিনিট পর্যন্ত আলাদা হতে পারে।
কলকাতার জন্য ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গণেশ পুজোর সময়: সকাল ১০টা ১৮ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত।
অন্যদিকে, নয়াদিল্লির জন্য সময় ১১টা ২ মিনিট থেকে ১টা ৩১ মিনিট। তাই কলকাতায় পুজো করলে দিল্লির সময় অনুসরণ না করে স্থানীয় সময় মেনে চলাই উচিত।
স্ক্রিনে লেখা যেতে পারে:
গণেশ চতুর্থী ২০২৬ — ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার
চতুর্থী তিথি: সকাল ৭:০৬, ১৪ সেপ্টেম্বর → সকাল ৭:৪৪, ১৫ সেপ্টেম্বর
কলকাতায় পুজোর শুভ সময়: সকাল ১০:১৮ – দুপুর ১২:৪৬
বাড়িতে গণেশ মূর্তি স্থাপনের আগে কী করবেন?
গণেশ পুজোর আগে বাড়ি এবং পুজোর জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নেওয়া প্রচলিত রীতি। এরপর পরিষ্কার জায়গায় পুজোর আসন তৈরি করে সেখানে গণপতির মূর্তি স্থাপন করা হয়।
অনেক পরিবারে লাল কাপড়ের উপর পিঁড়ি বা বেদি সাজিয়ে গণেশমূর্তি বসানোর রীতি রয়েছে। ফুল, আলপনা, প্রদীপ ও অন্যান্য পুজোর সামগ্রী দিয়ে জায়গাটি সাজানো যেতে পারে।
মূর্তি স্থাপনের পর ভক্তরা সংকল্প গ্রহণ করে পুজো শুরু করেন। পরিবার ও আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী পুজোর পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। তাই একটিমাত্র পদ্ধতিকেই সবার জন্য ‘অবশ্যই পালনীয়’ বলা ঠিক নয়।
গণেশ পুজোয় কী কী নিবেদন করা হয়?
গণপতির পুজোয় দুর্বা ঘাস ও মোদক বা লাড্ডু নিবেদন করার বিশেষ প্রচলন রয়েছে। ফুল, ধূপ, দীপ, চন্দন, নৈবেদ্য প্রভৃতিও পুজোর অংশ হতে পারে। কিছু রীতিতে লাল ফুল, নারকেল, গুড়, ঘি ইত্যাদিও নিবেদন করা হয়।
পুজোর একটি বিস্তৃত পদ্ধতিকে ‘ষোড়শোপচার’ বলা হয়, যেখানে আবাহন থেকে শুরু করে আসন, অর্ঘ্য, স্নান, বস্ত্র, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যসহ বিভিন্ন উপচার থাকে।
সহজভাবে বাড়িতে পুজো করতে গেলে প্রথমে গণেশকে স্নান বা প্রতীকীভাবে শুদ্ধজল নিবেদন, তারপর বস্ত্র ও গন্ধ, ফুল ও দুর্বা, ধূপ-দীপ এবং নৈবেদ্য দেওয়া যেতে পারে। শেষে আরতি করে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
পাঁচ রকম ফল দেওয়া কি বাধ্যতামূলক?
পাঁচ রকম ফল দেওয়ার চল অনেক বাড়িতে থাকলেও এটিকে সব গণেশ পুজোর জন্য বাধ্যতামূলক শাস্ত্রীয় নিয়ম হিসেবে বলা যায় না।
ভক্তির সঙ্গে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নৈবেদ্য নিবেদন করাই মূল কথা। মোদক বা লাড্ডু গণেশ পুজোর সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত হলেও অঞ্চল, পরিবার ও সম্প্রদায়ভেদে নৈবেদ্যের ধরন বদলাতে পারে।
কোন ভুলগুলি এড়িয়ে চলবেন?
গণেশ চতুর্থীর ক্ষেত্রে কিছু বিষয় প্রচলিত বিশ্বাস ও পঞ্জিকা-নির্দেশের অংশ। বিশেষ করে চতুর্থী তিথিতে চাঁদ দেখা এড়ানোর রীতি রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন চাঁদ দেখলে ‘মিথ্যা দোষ’ বা মিথ্যা অপবাদের আশঙ্কার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করা হয়। এই কারণে পঞ্জিকায় চন্দ্রদর্শন এড়ানোর সময়ও উল্লেখ করা হয়।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পুজোর সময় নিয়ে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি না করা। কারণ একই দিনে দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই বা অন্য শহরে মধ্যাহ্ন পুজোর সময় এক নয়। তাই নিজের শহরের স্থানীয় সময় দেখে পুজোর মুহূর্ত ঠিক করা ভালো।
পুজোকে শুধু বাহ্যিক আড়ম্বরের মধ্যে না রেখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ভক্তি এবং নিয়মিত উপাসনাকে গুরুত্ব দেওয়াও অনেক পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ রীতি।
গণেশ চতুর্থীতে উপবাস রাখতে হয়?
উপবাস গণেশ চতুর্থীর প্রচলিত ধর্মীয় আচারের একটি অংশ। তবে কে কতক্ষণ বা কীভাবে উপবাস করবেন, তা ব্যক্তি ও পারিবারিক রীতির উপর নির্ভর করতে পারে। কেউ নির্জলা বা কঠোর উপবাস করেন, আবার কেউ ফলাহার বা সীমিত আহার করেন।
তাই সকলের জন্য একই ধরনের উপবাসকে বাধ্যতামূলক নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী উপবাস পালন করাই বাস্তবসম্মত।
দান-পুণ্য, প্রদীপ জ্বালানো ও অন্যান্য বিশ্বাস
গণেশ চতুর্থীকে কেন্দ্র করে দান, দরিদ্রদের খাদ্য ও বস্ত্র দেওয়া, প্রাণীদের খাবার দেওয়া কিংবা সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর মতো নানা ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক রীতি রয়েছে।
অনেক ভক্ত মনে করেন, এদিন সৎকর্ম ও দান করলে পুণ্য লাভ হয়। একইভাবে ঘি-এর প্রদীপ জ্বালানোকে ঘরের মঙ্গল ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করার রীতিও কিছু পরিবারে প্রচলিত।
তবে এগুলিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ফল হিসেবে নয়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার হিসেবে দেখা উচিত।
১৮৯৩ সালে তিলকের উদ্যোগে বদলে যায় গণেশ উৎসবের চেহারা
আজকের সর্বজনীন গণেশোৎসবের ইতিহাসে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮৯৩ সালে তিনি গণেশ উৎসবকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পরিসর থেকে বৃহত্তর জনসমাগমের উৎসবে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন। ব্রিটিশ শাসনের সময় সামাজিক সংহতি ও জনসমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও এই উৎসবের ব্যবহার বাড়ে।
পরবর্তীকালে এই উৎসব দেশের নানা প্রান্তে বিস্তার লাভ করে এবং আজ গণেশ চতুর্থী শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বহু জায়গায় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎসবেরও রূপ নিয়েছে।
১০ দিন ধরে কি গণেশ উৎসব চলে?
অনেক জায়গায় গণেশোৎসব ১০ দিন ধরে পালিত হয়। গণেশ চতুর্থীতে প্রতিষ্ঠার পর অনন্ত চতুর্দশীতে বিসর্জনের মাধ্যমে বহু স্থানে উৎসবের সমাপ্তি হয়। তবে বাড়িতে গণপতি কতদিন রাখা হবে, সেই রীতিতে অঞ্চল ও পরিবারের ভেদে পার্থক্য রয়েছে।
২০২৬ সালে অনন্ত চতুর্দশী পড়ছে ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার।
গণেশ চতুর্থী ২০২৬: এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
উৎসব: গণেশ চতুর্থী
তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার
চতুর্থী তিথি শুরু: ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭:০৬
চতুর্থী তিথি শেষ: ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭:৪৪
কলকাতায় পুজোর সময়: সকাল ১০:১৮ থেকে দুপুর ১২:৪৬
বিসর্জন/অনন্ত চতুর্দশী: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, গণেশ পুজোর বিভিন্ন নিয়ম পঞ্জিকা, সম্প্রদায়, আঞ্চলিক রীতি এবং পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী বদলাতে পারে। তাই কোনও নির্দিষ্ট মন্ত্র, উপচার, উপবাস বা প্রতিকারকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নির্দিষ্ট আচার পালনের ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের পুরোহিত বা স্থানীয় পঞ্জিকার নির্দেশ অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ভক্তদের বিশ্বাসে গণপতি হলেন বিঘ্নহর্তা ও সিদ্ধিদাতা। তাই এই পবিত্র দিনে আড়ম্বরের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সংযম, ভক্তি এবং শুভকর্মকেই প্রাধান্য দেওয়াই হতে পারে গণেশ চতুর্থী পালনের সবচেয়ে সুন্দর বার্তা।



