বর্ষা নামলেই বাড়ে সাপের আনাগোনা। গ্রামাঞ্চলের ঝোপঝাড়, ধানখেত বা ইঁদুরের গর্ত থেকে শুরু করে শহরের বাড়ি, আবাসনের নিচতলা এমনকি বাথরুমেও কখনও কখনও সাপ ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটে। আর সাপে কামড়ানোর পর আতঙ্কে মানুষ এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে বড় ভুলগুলির মধ্যে রয়েছে ক্ষত কেটে দেওয়া, মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা এবং শক্ত করে দড়ি বা কাপড় বেঁধে দেওয়া। WHO এবং ভারতের সরকারি চিকিৎসা নির্দেশিকা—দুই জায়গাতেই এসব পদ্ধতি এড়াতে বলা হয়েছে।
তাহলে সাপে কামড়ালে আসলে কী করা উচিত? আর কোন ভুলগুলি একেবারেই নয়?
সাপে কামড়ালেই কি মৃত্যু নিশ্চিত?
একেবারেই নয়।
WHO জানিয়েছে, অনেক সাপের কামড় বিষহীন সাপের কারণে হয়। এমনকি বিষধর সাপ কামড়ালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যু তাৎক্ষণিক হয় না। দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
ভারতে অবশ্য সাপের কামড় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ সাপে কামড়ান এবং বিষক্রিয়ার কারণে উল্লেখযোগ্য মৃত্যু ও স্থায়ী অক্ষমতার ঘটনাও ঘটে।
তাই সাপটি বিষধর কি না, তা আন্দাজ করে সময় নষ্ট না করে প্রতিটি সন্দেহজনক সাপের কামড়কে জরুরি চিকিৎসার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত।
সাপের বিষ শরীরে কীভাবে ক্ষতি করতে পারে?
সব সাপের বিষের প্রভাব একরকম নয়। বিষের ধরন অনুযায়ী স্নায়ুতন্ত্র, রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া, পেশি বা কামড়ের আশপাশের টিস্যু আক্রান্ত হতে পারে।
কিছু বিষ প্রধানত স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে, যার ফলে চোখের পাতা নেমে আসা, গিলতে সমস্যা বা পেশির দুর্বলতা থেকে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা পর্যন্ত হতে পারে।
কিছু বিষ রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, ফলে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে।
আবার কিছু সাপের বিষ কামড়ের জায়গায় গুরুতর টিস্যু ক্ষতি ও ফোলা তৈরি করতে পারে।
তাই শুধুমাত্র কামড়ের জায়গা দেখে বিপদের মাত্রা বোঝা সবসময় সম্ভব নয়।
প্রথম ভুল: শক্ত করে দড়ি বা টুর্নিকেট বাঁধবেন না
অনেকেই মনে করেন, কামড়ের উপরে শক্ত করে কাপড়, দড়ি বা তার বাঁধলে বিষ শরীরে ছড়াতে পারবে না।
এই ধারণা বিপজ্জনক।
WHO স্পষ্টভাবে tight arterial tourniquet ব্যবহার না করতে বলেছে। খুব শক্ত করে বাঁধলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে অঙ্গের গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। ভারতের জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকাতেও টুর্নিকেট না করতে বলা হয়েছে।
তাই নিজের মতো করে শক্ত বাঁধন দেওয়ার বদলে আক্রান্ত অঙ্গকে স্থির রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় ভুল: ক্ষত কাটা বা বিষ চুষে বের করার চেষ্টা
সিনেমা বা পুরনো লোকবিশ্বাসে অনেক সময় দেখা যায়, সাপের কামড়ের জায়গা কেটে দিয়ে রক্ত বের করে দেওয়া হচ্ছে কিংবা কেউ মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করছেন।
বাস্তবে এসব করা উচিত নয়।
WHO জানিয়েছে, ক্ষত কেটে দেওয়া বা মুখ দিয়ে বিষ চোষার মতো পদ্ধতি কার্যকর নয় এবং বিপজ্জনকও হতে পারে। এতে অতিরিক্ত রক্তপাত, টিস্যুর ক্ষতি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভারতের Standard Treatment Guidelines-এও ক্ষতস্থানে incision, suction, rubbing, massage বা বিভিন্ন রাসায়নিক/ভেষজ পদার্থ লাগানো নিষেধ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ক্ষত কাটা নয়, ক্ষত চোষা নয়।
তৃতীয় ভুল: ওঝা-গুণিনের কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করা
ঝাড়ফুঁক, ভেষজ ওষুধ, কালো পাথর বা অন্যান্য প্রচলিত ‘বিষ নামানোর’ পদ্ধতির কোনও প্রমাণিত ভূমিকা নেই।
WHO বলছে, এ ধরনের প্রথাগত চিকিৎসা কার্যকর নয় এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হল—এগুলির কারণে হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হয়।
সাপে কামড়ানোর পর যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে সাপে কামড়ালে প্রথমে কী করবেন?
প্রথম কাজ—আতঙ্কিত হবেন না এবং রোগীকে শান্ত রাখুন।
তারপর রোগীকে যতটা সম্ভব কম নড়াচড়া করিয়ে আক্রান্ত অঙ্গটি স্থির রাখতে হবে। হাত বা পা হলে স্প্লিন্ট বা শক্ত কোনও সমর্থন দিয়ে সেটিকে নড়াচড়া থেকে বিরত রাখা যেতে পারে। WHO-ও পুরো শরীরের নড়াচড়া কমিয়ে আক্রান্ত অঙ্গ immobilize করার পরামর্শ দেয়।
কামড়ের জায়গায় আংটি, ঘড়ি, পায়েল, চুড়ি বা অন্য কোনও শক্ত জিনিস থাকলে ফোলা শুরু হওয়ার আগেই খুলে দেওয়া উচিত।
এরপর দেরি না করে রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
রোগীকে হাঁটিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন?
সম্ভব হলে না।
যত বেশি নড়াচড়া হবে, তত বেশি সমস্যা তৈরি হতে পারে। WHO-এর নির্দেশিকায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব সম্পূর্ণভাবে স্থির রাখার এবং সম্ভব হলে স্ট্রেচার বা অনুরূপ ব্যবস্থায় পরিবহনের কথা বলা হয়েছে।
তাই রোগীকে নিজের পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নিরাপদে বহন করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনো ভালো।
সাপটিকে ধরতে যাবেন না
সাপটিকে শনাক্ত করতে গিয়ে দ্বিতীয়বার বিপদ ডেকে আনা উচিত নয়।
WHO-এর প্রোটোকলেও বলা হয়েছে, সাপটিকে ধরার বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করতে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে ছবি তোলার সুযোগ থাকলে ছবি চিকিৎসকদের কাজে লাগতে পারে, কিন্তু তার জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা চলবে না।
অর্থাৎ সাপ ধরতে গিয়ে আরেকটি কামড়ের ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।
হাসপাতালে কী চিকিৎসা দেওয়া হয়?
প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে রোগীর শারীরিক লক্ষণ, রক্তক্ষরণ, স্নায়বিক সমস্যা, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং অন্যান্য জটিলতা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বিষক্রিয়ার লক্ষণ থাকলে উপযুক্ত অ্যান্টিভেনম বা অ্যান্টিস্নেক ভেনম দেওয়া হতে পারে। WHO জানিয়েছে, বিষধর সাপের বিষক্রিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধ বা উল্টে দেওয়ার জন্য অ্যান্টিভেনমই প্রধান কার্যকর চিকিৎসা।
কোন রোগীর কতটা অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন হবে, তা চিকিৎসকরাই নির্ধারণ করেন। তাই নিজের মতো করে কোনও ওষুধ বা অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা উচিত নয়।
হাসপাতালে যাওয়ার পথে কী খেয়াল রাখবেন?
রোগীকে শান্ত রাখুন এবং যতটা সম্ভব স্থির রাখুন।
বমি হলে শ্বাসনালীতে বমি ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে WHO রোগীকে বাঁ দিকে কাত করে recovery position-এ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি শ্বাসপ্রশ্বাসের উপর নজর রাখা জরুরি।
যদি রোগীর শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, সেটিকে অত্যন্ত জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে ধরে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
সব সাপের কামড় কি অ্যান্টিভেনম লাগে?
না। অ্যান্টিভেনম চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
কারণ সব সাপ বিষধর নয় এবং বিষধর সাপের কামড় হলেও সব ক্ষেত্রে একই মাত্রার বিষক্রিয়া হয় না। তাই শুধু “সাপে কামড়েছে” শুনে নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিভেনম দেওয়া যায় না। হাসপাতালে রোগীর উপসর্গ, পরীক্ষার ফল এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাপে কামড়ালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কথা
শান্ত থাকুন।
আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব স্থির রাখুন।
কামড়ানো অঙ্গ immobilize করুন।
আংটি, ঘড়ি বা শক্ত জিনিস খুলে দিন।
এক মুহূর্ত দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান।
আর একইসঙ্গে মনে রাখুন—ক্ষত কাটবেন না, বিষ চুষবেন না, শক্ত করে দড়ি বাঁধবেন না এবং ঝাড়ফুঁকে সময় নষ্ট করবেন না।
সাপে কামড়ানোর পর সবচেয়ে বড় ‘ওষুধ’ হল সময় নষ্ট না করা
সাপে কামড়ানোর পর আতঙ্কে মানুষ অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। অথচ সঠিক প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং দ্রুত চিকিৎসা পাওয়াই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
WHO-এর মতে, সাপে কামড়ানোর ক্ষেত্রে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়াই ফলাফল উন্নত করার অন্যতম প্রধান উপায়।
তাই কোনও ব্যক্তিকে সাপে কামড়ালে “বিষ নামবে কি না” ভেবে বসে থাকা নয়, কিংবা ওঝার কাছে যাওয়ার জন্য সময় নষ্ট করা নয়—সরাসরি চিকিৎসার পথে যাওয়া উচিত।
শেষ কথা
সাপে কামড়ানো মানেই মৃত্যু নয়। কিন্তু সাপে কামড়ানোর পর ভুল চিকিৎসা বা ভুল প্রাথমিক পদক্ষেপ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সিনেমার দৃশ্যের মতো ক্ষত চুষে নেওয়া, কামড়ের জায়গা কেটে দেওয়া কিংবা শক্ত করে দড়ি বাঁধার বদলে রোগীকে শান্ত রাখুন, আক্রান্ত অঙ্গ স্থির করুন এবং যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছন।
কারণ সাপে কামড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—“বিষ কতটা?” নয়, “চিকিৎসা পেতে কত দ্রুত পৌঁছল?”



