বিরিয়ানির চাল অস্বাভাবিক লালচে, তন্দুরি চিকেন অতিরিক্ত উজ্জ্বল কমলা, মিষ্টির রং চোখে লাগার মতো গাঢ়—খাবার দেখেই অনেক সময় সন্দেহ জাগে। কিন্তু শুধু খাবারের রং দেখেই তাতে নিষিদ্ধ কৃত্রিম রং বা শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত ডাই মেশানো হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায় না।
কারণ সব কৃত্রিম খাদ্যরং নিষিদ্ধ নয়। ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা বিধিতে নির্দিষ্ট কিছু synthetic food colour নির্দিষ্ট খাবারে নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু রং খাদ্যে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
তাই বাইরে খাওয়ার সময় কোন লক্ষণগুলি খেয়াল করবেন, কোন ঘরোয়া পরীক্ষা সত্যিই কাজে লাগে এবং কোন ক্ষেত্রে ল্যাব পরীক্ষাই ভরসা—জেনে রাখা জরুরি।
খাবারে কৃত্রিম রং নিয়ে এত সতর্কতার কারণ কী?
খাবারের রং মূলত তার চেহারা আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু খাদ্যে ব্যবহৃত রং অবশ্যই নির্দিষ্ট খাদ্য-নিরাপত্তা নিয়ম মেনে ব্যবহার করতে হয়।
FSSAI-র নথিতে আট ধরনের permitted synthetic food colour-এর কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে Carmoisine, Ponceau 4R, Erythrosine, Tartrazine, Sunset Yellow FCF, Indigo Carmine, Brilliant Blue FCF এবং Fast Green FCF। এগুলিও অবশ্য সব খাবারে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা যায় না; নির্দিষ্ট খাবার ও নির্ধারিত মাত্রার নিয়ম রয়েছে।
অন্যদিকে Metanil Yellow, Rhodamine B, Auramine এবং বিভিন্ন Sudan dye-কে FSSAI-এর নথিতে খাদ্যে ব্যবহৃত অননুমোদিত রং বা adulterant হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু উজ্জ্বল রং দেখেই কি খাবারকে ভেজাল বলা যায়?
না।
খাবার খুব উজ্জ্বল দেখালেই সেটি নিষিদ্ধ রং দিয়ে তৈরি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। আবার স্বাভাবিক দেখালেই খাবার নিরাপদ, সেটিও নিশ্চিত করে বলা যায় না।
FSSAI-র তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত synthetic colour-ও নির্দিষ্ট খাবারে নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হয়। ফলে খাবারের রং দেখে প্রাথমিক সন্দেহ তৈরি হতে পারে, কিন্তু রাসায়নিকভাবে কোন রং কতটা রয়েছে তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
ঘরে বসে কোন খাবারের পরীক্ষা করা যায়?
FSSAI নিজেই DART—Detect Adulteration with Rapid Test উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে কিছু ভেজাল শনাক্ত করার পদ্ধতি জানিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পরীক্ষার নির্দিষ্ট খাবার ও নির্দিষ্ট adulterant রয়েছে।
হলুদ গুঁড়োয় কৃত্রিম রং
FSSAI-এর DART পদ্ধতিতে এক গ্লাস জলে এক চামচ হলুদ গুঁড়ো দিয়ে পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
প্রাকৃতিক হলুদ জলে তুলনামূলক হালকা হলুদ আভা তৈরি করে নিচে বসে যেতে পারে। অন্যদিকে কৃত্রিম রং মেশানো হলে জলে বেশি তীব্র হলুদ রং ছড়ানোর লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
তবে এই পরীক্ষাকে যে কোনও খাবারে নিষিদ্ধ রং শনাক্ত করার সাধারণ পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
লঙ্কার গুঁড়োয় কৃত্রিম রং
FSSAI-এর Eat Right India হ্যান্ডবুকে লাল লঙ্কার গুঁড়োয় কৃত্রিম রং শনাক্ত করার একটি সহজ পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। জলের উপর সামান্য লঙ্কার গুঁড়ো ছড়ালে কৃত্রিম রং থাকলে রঙের রেখা জলের মধ্যে নেমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
অর্থাৎ, কোন খাবারের ক্ষেত্রে কোন পরীক্ষা প্রযোজ্য—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিরিয়ানি বা তন্দুরি চিকেনের রং দেখে কী করবেন?
বিরিয়ানি, কাবাব বা তন্দুরি চিকেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উজ্জ্বল রং দেখলে সতর্ক হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু রং দেখে Metanil Yellow, Sudan Red বা Rhodamine B-এর মতো নির্দিষ্ট রাসায়নিক শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
তাই ‘হাতে ঘষলে দাগ পড়ল মানেই বিষাক্ত রং’—এই ধরনের পরীক্ষাকে নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে ধরা উচিত নয়।
একইভাবে জলে খাবার ফেলে জল লাল বা হলুদ হয়ে গেলেই সেটি নিষিদ্ধ রং—এমন সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ নয়। কোনও খাবারে রং মেশানো হয়েছে কি না এবং সেটি অনুমোদিত কি না, তা নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার দরকার হতে পারে।
খাবারে রং ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নিয়ম
FSSAI-এর বিধি অনুযায়ী, অনুমোদিত synthetic food colour-ও নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যবহার করা যায়। সাধারণভাবে অনুমোদিত synthetic food colour-এর সর্বোচ্চ মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে 100 ppm-এর মধ্যে রাখা হয়েছে; কিছু নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সীমা 200 ppm পর্যন্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, ‘কৃত্রিম রং’ মানেই ‘বিষ’—এমন সরল সমীকরণও ঠিক নয়। আসল প্রশ্ন হল, কোন রং ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ওই খাবারে অনুমোদিত কি না এবং নির্ধারিত মাত্রা মেনে ব্যবহার করা হয়েছে কি না।
রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় কী কী খেয়াল করবেন?
বাইরে খাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, খাবারের অস্বাভাবিক রং বা চেহারা নিয়ে সন্দেহ হলে সেই খাবার এড়িয়ে চলুন।
দ্বিতীয়ত, রেস্তোরাঁ বা খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খাদ্য-নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য এবং FSSAI লাইসেন্স/রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি খেয়াল করতে পারেন।
তৃতীয়ত, অতিরিক্ত রংযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস না করাই ভালো।
FSSAI-এর খাদ্য-নিরাপত্তা নির্দেশিকাতেও খাদ্য ব্যবসায়ীদের শুধুমাত্র অনুমোদিত colour ও flavour ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
খাবার নিয়ে সন্দেহ হলে কোথায় পরীক্ষা করাবেন?
কোনও খাবারে নিষিদ্ধ রাসায়নিক রং রয়েছে বলে গুরুতর সন্দেহ হলে চোখে দেখে বা ঘরোয়া পরীক্ষার ফলের উপর নির্ভর না করে Food Analyst-এর মাধ্যমে পরীক্ষা করানোই বেশি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
FSSAI-এর Eat Right India হ্যান্ডবুকেও ভেজাল সম্পর্কে নিশ্চিত হতে খাদ্যপণ্য Food Analyst-এর কাছে পরীক্ষা করানোর সুযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
খাবারের রং নিয়ে সচেতন হওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু একই সঙ্গে ভুল তথ্য থেকেও সতর্ক থাকতে হবে।
অতিরিক্ত উজ্জ্বল রং সন্দেহের কারণ হতে পারে, কিন্তু সেটি নিজে থেকে ভেজালের প্রমাণ নয়। আবার FSSAI অনুমোদিত খাদ্যরংও নির্দিষ্ট নিয়ম ও মাত্রার বাইরে ব্যবহার করা যাবে না।
তাই বিরিয়ানি, মিষ্টি, তন্দুরি বা অন্য কোনও খাবার কেনার সময় শুধু চোখের রং নয়—খাদ্যের মান, পরিচ্ছন্নতা এবং বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও গুরুত্ব দিন। সন্দেহজনক খাবার হলে না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত; আর ভেজালের নিশ্চিত প্রমাণ প্রয়োজন হলে উপযুক্ত খাদ্য পরীক্ষাই চূড়ান্ত ভরসা।



