দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি নিয়ে সরকারি বিজ্ঞাপন। সেখানে দেবী দুর্গার ছবি। কিন্তু ছবিতে দেখা গেল এমন এক ত্রুটি, যা প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হল তীব্র বিতর্ক। প্রচলিত দশভূজা রূপের বদলে সরকারি বিজ্ঞাপনে দেবী দুর্গার ১১টি হাত দেখা যায়। একটি অতিরিক্ত হাত কীভাবে সরকারি বিজ্ঞাপনের নকশায় জায়গা পেল, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই মুখ খুলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর দাবি, এটি বিজ্ঞাপন সংস্থার ভুল হতে পারে এবং বিষয়টি সংশোধন করে নেওয়া হবে। পরে বিতর্কিত বিজ্ঞাপনের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমাও চান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কী ঘটেছিল সরকারি বিজ্ঞাপনে?
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি ও সমন্বয় বৈঠককে সামনে রেখে রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তরফে বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়।
সেই বিজ্ঞাপনের উপরের অংশেই ছিল দেবী দুর্গার ছবি। ছবিতে প্রচলিত দশভূজা রূপের বদলে চোখে পড়ে ১১টি হাত। বিজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবিও ছিল। ফলে বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
শুধু সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনেই নয়, পরে দুর্গাপুজো সংক্রান্ত বৈঠনের মঞ্চেও একই ধরনের ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। বিতর্ক ছড়ানোর পর সেখানে একটি অতিরিক্ত হাত মুছে ফেলার ব্যবস্থা করা হয় বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
কেন ১১ হাতের ছবি নিয়ে এত বিতর্ক?
দেবী দুর্গার যে রূপটি বাংলার দুর্গাপুজোয় সবচেয়ে পরিচিত, সেখানে তাঁকে সাধারণত দশভূজা হিসেবেই দেখা যায়। সেই রূপে দেবীর দশ হাতে বিভিন্ন অস্ত্র থাকার প্রচলিত চিত্র রয়েছে।
ফলে সরকারি পুজো-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনে দেবীর একটি অতিরিক্ত হাত দেখা যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—ছবিটি প্রকাশের আগে তা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না।
তবে একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার, ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবদেবীর একাধিক রূপ ও আঞ্চলিক উপস্থাপনা রয়েছে। তাই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু এখানে মূলত সরকারি বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ছবিটির সঙ্গে প্রচলিত দশভূজা দুর্গার রূপের অসঙ্গতি, কোনও সর্বজনীন ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত নয়।
বিরোধীদের আক্রমণের নিশানায় রাজ্য সরকার
ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পরই তৃণমূল ও সিপিএমের নেতারা সামাজিক মাধ্যমে সরব হন।
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে সরকারি বিজ্ঞাপনে দশভূজা দুর্গার বদলে ১১ হাতের ছবি চলে এল। তাঁর বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক কটাক্ষও ছিল।
সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষও বিজ্ঞাপনের ছবি তুলে ধরে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—দেবীর প্রচলিত দশ হাতের বদলে সরকারি প্রচারে কেন একটি অতিরিক্ত হাত দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ, একটি গ্রাফিক ডিজাইনের ভুল দ্রুতই রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।
শমীক ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া কী?
বিতর্কের মধ্যে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
প্রথমে খানিক রসিকতার সুরে তিনি বলেন, “মা দুর্গা আরও শক্তিশালী হয়ে গিয়েছেন।” পরে তিনি স্পষ্ট করেন, বিজ্ঞাপনটি কোনও এজেন্সির ভুলের কারণে এমন হয়ে থাকতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি রাজনৈতিক বিষয় নয় এবং ভুলটি সংশোধন করা হবে।
অর্থাৎ, বিজেপির পক্ষ থেকে ছবিটির ১১ হাতকে কোনও নতুন ধর্মীয় রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বরং ঘটনাটিকে বিজ্ঞাপন তৈরির সময়কার ত্রুটি হিসেবেই দেখা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী
বিতর্ক আরও বাড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সরাসরি বক্তব্য দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি ও সমন্বয় বৈঠকে বক্তব্যের শুরুতেই তিনি ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপনের জন্য ক্ষমা চান। তিনি জানান, বিজ্ঞাপন প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের বিষয়ে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
ফলে সরকারের পক্ষ থেকে শেষ পর্যন্ত অবস্থানটি পরিষ্কার—১১ হাতের ছবিটি কোনও পরিকল্পিত নতুন উপস্থাপনা নয়, বরং বিজ্ঞাপনের ত্রুটি।
ভুলটি কোথায় হয়েছিল, প্রশ্ন সেটিই
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, একটি সরকারি বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে তার ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট কতটা গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হয়েছিল।
বিশেষ করে দুর্গাপুজোর মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের সরকারি প্রচারে ব্যবহৃত ছবির ক্ষেত্রে সামান্য গ্রাফিক ভুলও বড় বিতর্ক তৈরি করতে পারে। এই ঘটনার পর তাই শুধু রাজনৈতিক চাপানউতোর নয়, সরকারি প্রচারের কনটেন্ট যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এখানে বিজ্ঞাপন সংস্থার ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই চূড়ান্ত প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের যাচাই ব্যবস্থাও আলোচনায় আসা স্বাভাবিক।
নেটপাড়ায় এখনও চলছে আলোচনা
মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমাপ্রার্থনা এবং ভুল সংশোধনের উদ্যোগের পর সরকারি অবস্থান স্পষ্ট হলেও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক থামেনি।
কারও কাছে এটি নিছক একটি গ্রাফিক ডিজাইনের ভুল, আবার কেউ সরকারি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে এমন ভুলকে গুরুতর গাফিলতি বলে মনে করছেন। রাজনৈতিক দলগুলি অবশ্য ইতিমধ্যেই নিজেদের মতো করে ঘটনাটিকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
এক নজরে পুরো ঘটনা
- দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি ও সমন্বয় বৈঠককে সামনে রেখে সরকারি বিজ্ঞাপন প্রকাশ।
- বিজ্ঞাপনে দেবী দুর্গার প্রচলিত দশভূজা রূপের বদলে ১১টি হাত দেখা যায়।
- তৃণমূল ও সিপিএমের নেতারা বিষয়টি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।
- বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এটিকে বিজ্ঞাপন সংস্থার সম্ভাব্য ভুল বলে জানান।
- পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপনের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।
- সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকার কথা জানানো হয়েছে।
তাহলে কি সত্যিই ‘একাদশভূজা’ হলেন মা দুর্গা?
না—এই সরকারি বিজ্ঞাপনকে দেখে এমন কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি ভুল সরকারি বিজ্ঞাপনচিত্র। বিজেপির রাজ্য সভাপতি নিজেই এটিকে বিজ্ঞাপন সংস্থার ত্রুটি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং মুখ্যমন্ত্রীও ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপনের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
ফলে ‘দশভূজা থেকে একাদশভূজা’ কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত বা নতুন ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়। বরং দুর্গাপুজোর মতো সংবেদনশীল একটি বিষয়ে সরকারি প্রচারে ছবি যাচাইয়ের গুরুত্ব কতটা, এই ঘটনাই তা নতুন করে সামনে এনে দিল।



