ভাদ্রে রান্না, আশ্বিনে খাওয়া—বাঙালির এই অদ্ভুত অথচ প্রাচীন রীতির নাম অরন্ধন। রান্নাঘরে আগুন জ্বলে না, অথচ আগের রাতেই তৈরি হয়ে যায় হরেক রকম পদ। পরদিন সেই খাবারই পরিবেশন করা হয়। কোথাও পান্তা ভাত, কোথাও ইলিশ-চিংড়ি, আবার কোথাও শাক, ডাল, ভাজা, চাটনি আর মিষ্টি—অরন্ধনের পাতে ধরা পড়ে বাংলার ঘরোয়া খাদ্যসংস্কৃতির এক পুরনো ছবি।
কিন্তু কেন এই রীতি? কেনই বা ভাদ্রের শেষ দিনে রান্না করে পরের দিন খাওয়া হয়? আর এর সঙ্গে দেবী মনসার সম্পর্কই বা কী?
অরন্ধন উৎসব আসলে কী?
‘অরন্ধন’ শব্দের অর্থই হল রান্না না করা। এই লোকাচারের মূল নিয়ম, নির্দিষ্ট দিনে বাড়ির উনুন না জ্বালিয়ে আগের দিন রান্না করে রাখা খাবার খাওয়া।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব ‘রান্না পুজো’, ‘উনুন পুজো’, ‘ইচ্ছা রান্না’, ‘বুড়ো রান্না’, ‘আটাশে রান্না’ বা ‘ধরাটে রান্না’ নামেও পরিচিত। অবশ্য নাম ও আচার পরিবার এবং অঞ্চলভেদে বদলে যায়।
ভাদ্র সংক্রান্তির অরন্ধনকে বিশেষভাবে দেবী মনসার পুজোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বাংলার বহু পরিবারে রান্নাঘরের একটি অংশ পরিষ্কার করে সেখানে মনসার ঘট বসানো হয়। কোথাও ফণিমনসা গাছের ডাল, কোথাও শালুকের ডাল বা অন্য প্রতীকী উপকরণ দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়।
কেন ভাদ্রে রেঁধে আশ্বিনে খাওয়া হয়?
অরন্ধনের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্যই হল—আগের দিন রান্না, পরের দিন খাওয়া।
ভাদ্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ সংক্রান্তিকে ঘিরে এই রান্নার আয়োজন করা হয়। অনেক পরিবারে রাত পর্যন্ত রান্না চলে। তারপর পরদিন, অর্থাৎ আশ্বিনের প্রথম দিনে সেই খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে।
এই কারণেই লোকমুখে অরন্ধনকে বলা হয়—‘ভাদ্রে রেঁধে আশ্বিনে খাওয়া’।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—সব পরিবারে একইভাবে এই রীতি পালিত হয় না। কোথাও সংক্রান্তির দিনই ভোগ দেওয়া ও খাওয়ার রীতি রয়েছে, আবার কোথাও পরের দিন খাবার গ্রহণ করা হয়।
রান্না পুজোর সঙ্গে মনসার সম্পর্ক কোথায়?
অরন্ধনকে শুধু রান্নার উৎসব হিসেবে দেখলে এর লোকসংস্কৃতির দিকটি বাদ পড়ে যায়। ভাদ্র সংক্রান্তির এই আচারের সঙ্গে বহু অঞ্চলে দেবী মনসার আরাধনা জড়িয়ে রয়েছে।
বর্ষাকাল শেষ হওয়ার সময় বাংলার গ্রামাঞ্চলে সাপের উপদ্রব নিয়ে নানা লোকবিশ্বাস প্রচলিত ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সর্পদেবী মনসার পুজোর সঙ্গে পরিবারের মঙ্গল, অন্নের নিরাপত্তা এবং সাপের ভয় থেকে রক্ষার কামনাও যুক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন লোকাচার-ভিত্তিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে এর সবটাই ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাসের অংশ; এটিকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত একক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রান্নাঘরেই কেন পুজো?
অরন্ধনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল হেঁশেল বা উনুনকে কেন্দ্র করে আচার পালন।
অনেক বাড়িতে রান্নাঘরের নির্দিষ্ট জায়গা পরিষ্কার করে আলপনা দেওয়া হয়। সেখানে ঘট বসিয়ে ফণিমনসা বা শালুকের ডাল রাখা হয়। কোথাও আবার মনসার প্রতিমা কিংবা পাঁচ ফণাযুক্ত সর্পের প্রতীকও দেখা যায়।
অর্থাৎ, যে উনুন সারা বছর পরিবারের খাবার তৈরি করে, অরন্ধনের দিনে সেই রান্নাঘরই হয়ে ওঠে পুজোর অন্যতম কেন্দ্র।
অরন্ধনের পাতে কী কী থাকে?
অরন্ধনের খাবারের তালিকাও একেবারে অঞ্চলভেদে আলাদা।
আমিষ পরিবারে ইলিশ, চিংড়ি-সহ বিভিন্ন মাছ রান্না করার রীতি রয়েছে। ভাদ্র মাসে পাওয়া মরসুমি মাছ ও সবজিকেও অনেক পরিবার এই উৎসবের রান্নায় গুরুত্ব দেয়।
অন্যদিকে নিরামিষ আয়োজনে থাকতে পারে—
- পান্তা ভাত
- বিভিন্ন রকম ভাজা
- কচুশাক
- অন্যান্য শাক
- ছোলা-নারকেল দিয়ে রান্না
- মুগ ডাল
- খেসারির ডাল
- চালতা-গুড়ের চাটনি
- তালের বড়া
- মালপোয়া
পান্তা ভাত অবশ্য এই উৎসবের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত খাবারগুলির একটি।
অরন্ধন কি শুধু একবারই হয়?
না। বাংলার প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী বছরে দু’বার অরন্ধন পালনের কথা পাওয়া যায়।
একটি হয় মাঘ মাসে সরস্বতী পুজোর পরের দিন শীতলষষ্ঠী উপলক্ষে। অন্যটি ভাদ্র সংক্রান্তিতে, মনসা পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে।
দুই ক্ষেত্রেই মূল ভাবনা—নির্দিষ্ট দিনে উনুন না জ্বালিয়ে আগের দিনের রান্না খাওয়া।
বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে কি অরন্ধনের সম্পর্ক?
এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দুটি উৎসব প্রায় একই সময় পালিত হওয়ায় অনেকের ধারণা, অরন্ধন বুঝি বিশ্বকর্মা পুজোরই অংশ। কিন্তু লোকাচার-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী অরন্ধনের প্রধান যোগ দেবী মনসা ও ভাদ্র সংক্রান্তির সঙ্গে। বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে এর সরাসরি ধর্মীয় সম্পর্ক নেই।
তবে একই সময়ের কাছাকাছি পালিত হওয়ার কারণে বাংলার বহু পরিবারে দুটির আচার-অনুষ্ঠান একসঙ্গে মিশে গিয়েছে।
২০২৬ সালে অরন্ধন কবে?
২০২৬ সালের তারিখ নিয়ে পঞ্জিকা-ভেদে মতপার্থক্য রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকায় বিশ্বকর্মা পুজোর তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, কয়েকটি সাম্প্রতিক বাংলা পঞ্জিকা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-কে বিশ্বকর্মা পুজো এবং অরন্ধনের দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যা, সূর্যের কন্যা রাশিতে প্রবেশের সময়ের ভিত্তিতে এ বছর ভাদ্র সংক্রান্তির গণনায় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তাই ১৯ সেপ্টেম্বরকে ২০২৬ সালের অরন্ধনের নিশ্চিত তারিখ বলা ঠিক হবে না। যে পরিবার যে পঞ্জিকা অনুসরণ করে, সেই অনুযায়ী তারিখ মেনে চলাই প্রচলিত রীতি।
কেন এই তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি?
বিশ্বকর্মা পুজো মূলত একটি সৌর সংক্রান্তি-নির্ভর উৎসব। সূর্যের কন্যা রাশিতে প্রবেশের সময়কে কেন্দ্র করে এর তারিখ নির্ধারিত হয়। সেই সংক্রান্তির সময় কখন পড়ছে এবং কোন পঞ্জিকার গণনা অনুসরণ করা হচ্ছে, তার ওপর তারিখে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
এই কারণেই ২০২৬ সালে ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আলাদা তথ্য দেখা যাচ্ছে।
কেন এখনও টিকে আছে এই পুরনো রীতি?
সময় বদলেছে। শহুরে জীবনে সারা রাত ধরে রান্না করা কিংবা পরদিন সারাদিন আগের দিনের খাবার খাওয়ার রীতি অনেক পরিবারেই কমেছে।
কিন্তু গ্রামবাংলা ও শহরতলির বহু পরিবারে এখনও অরন্ধনের আয়োজন দেখা যায়। রান্নাঘর পরিষ্কার করা, উনুন পুজো, মনসার ঘট বসানো, মরসুমি খাবার রান্না এবং আত্মীয়-পরিজনকে খাওয়ানো—সব মিলিয়ে এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বাংলার লোকসংস্কৃতি ও পারিবারিক খাদ্যসংস্কৃতিরও একটি অংশ।
প্রচলিত বর্ণনায় এই রীতির চল বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গের আদি বাঙালি বা এদেশীয় পরিবারগুলির মধ্যে বেশি দেখা যায়; পূর্ববঙ্গীয় পরিবারের মধ্যে এটি একইভাবে প্রচলিত ছিল না বলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে এটিকে সব পরিবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি কঠোর বিভাজন হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
FACT CHECK
দাবি: ২০২৬ সালে অরন্ধন নিশ্চিতভাবে ১৯ সেপ্টেম্বর।
রায়: নিশ্চিত নয়। ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর নিয়ে পঞ্জিকা ও সূত্রভেদে পার্থক্য রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সরকারি ছুটির তালিকায় বিশ্বকর্মা পুজো ১৭ সেপ্টেম্বর, আবার কয়েকটি সাম্প্রতিক পঞ্জিকা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে ১৮ সেপ্টেম্বর উল্লেখ করা হয়েছে।
দাবি: অরন্ধন বছরে দু’বার পালিত হয়।
রায়: প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী সঠিক। মাঘের শীতলষষ্ঠী এবং ভাদ্র সংক্রান্তিতে অরন্ধনের রীতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
দাবি: অরন্ধন সরাসরি বিশ্বকর্মা পুজোর অংশ।
রায়: বিভ্রান্তিকর। অরন্ধনের মূল যোগ ভাদ্র সংক্রান্তি ও মনসা পুজোর সঙ্গে; বিশ্বকর্মা পুজোর সময়ের সঙ্গে এটি ঐতিহাসিকভাবে পাশাপাশি এসে গিয়েছে।
দাবি: সব বাঙালি পরিবারে একই নিয়মে অরন্ধন হয়।
রায়: ভুল। অঞ্চল, পরিবার ও সম্প্রদায়ভেদে পুজোর ধরন, খাবার এবং অরন্ধনের দিন আলাদা হতে পারে।



