Sunday, September 20, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটনতুন নাম ও প্রতীকে ভাগ তৃণমূল! মমতার ফুটবল খেলোয়াড়, ঋতব্রত শিবিরে খাম

নতুন নাম ও প্রতীকে ভাগ তৃণমূল! মমতার ফুটবল খেলোয়াড়, ঋতব্রত শিবিরে খাম

২৮ বছরের রাজনৈতিক পরিচয়ে বড় ধাক্কা তৃণমূল কংগ্রেসের। তবে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক চিরতরে হারিয়ে গেল—বিষয়টি এখনও তেমন নয়। নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশে আপাতত ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং সংরক্ষিত ‘ফুল ও ঘাস’ প্রতীক ব্যবহারে দুই গোষ্ঠীর উপরই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে।

আর এই পরিস্থিতিতেই আসন্ন উপনির্বাচনের জন্য দুই শিবিরকে দেওয়া হল আলাদা নাম ও প্রতীক।

একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী এবার লড়বে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে। তাদের প্রতীক ‘ফুটবল খেলোয়াড়’

অন্যদিকে, অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় যে গোষ্ঠীর হয়ে নির্বাচন কমিশনে প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেই শিবিরের নাম হয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’। তাদের প্রতীক ‘খাম’ বা Envelope

কেন জোড়া ঘাসফুল ফ্রিজ করল নির্বাচন কমিশন?

পুরো ঘটনার সূত্রপাত তৃণমূলের সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নিয়ে বিবাদ থেকে।

নির্বাচন কমিশনের সামনে দুই পক্ষই দাবি করেছে, তারাই আসল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। কমিশনের ১৭ সেপ্টেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্দেশে বলা হয়েছে, বর্তমানে দলের মধ্যে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী রয়েছে—একটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে, অন্যটি অরূপ রায়ের নেতৃত্বে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে Election Symbols (Reservation and Allotment) Order, 1968-এর Paragraph 15 অনুযায়ী বিস্তারিত শুনানি ও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

কিন্তু সামনে উপনির্বাচন। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দুই গোষ্ঠীকে একই নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে দিলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে দু’পক্ষকেই পুরনো নাম ও প্রতীক ব্যবহার থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

মমতা শিবিরের নতুন নাম কী?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর জন্য নির্বাচন কমিশন বরাদ্দ করেছে—

নাম: ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’
প্রতীক: ‘ফুটবল খেলোয়াড়’

এর আগে মমতা শিবির বিকল্প প্রতীক হিসেবে ফুটবল এবং ক্রিকেট ব্যাট—এই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কমিশন ফুটবল খেলোয়াড় প্রতীক বরাদ্দ করেছে।

অর্থাৎ, আপাতত EVM-এ পরিচিত জোড়া ঘাসফুলের বদলে মমতা শিবিরের প্রার্থীর পাশে দেখা যাবে নতুন প্রতীক।

ঋতব্রত-অরূপ শিবিরের নাম কী?

বিরোধী গোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ হয়েছে—

নাম: ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’
প্রতীক: ‘খাম’ বা Envelope

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। রাজনৈতিক আলোচনায় এই গোষ্ঠীকে অনেক সময় ‘ঋতব্রত শিবির’ বলা হলেও নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী আদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীটির নেতৃত্ব হিসেবে অরূপ রায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এই শিবিরের হয়ে কমিশনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

নন্দীগ্রামে ‘খাম’ নিয়ে নতুন জটিলতা?

এখানেই তৈরি হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

‘খাম’ প্রতীকটি আগেও আইএসএফের সঙ্গে যুক্ত ছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, একই সময়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় প্রতীক নিয়ে সংঘাত তৈরি হলে একই প্রতীক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে দেওয়া যায় না। ফলে নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে নতুন সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ, ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’-এর খাম প্রতীক বরাদ্দ হলেও মাঠে বাস্তবে কোন প্রার্থী কোন প্রতীক নিয়ে লড়বেন, সেই বিষয়টি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিয়ম মেনেই চূড়ান্ত হবে।

এটা কি তৃণমূলের স্থায়ী বিভাজন?

এই মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।

কারণ নির্বাচন কমিশনের বর্তমান ব্যবস্থা অন্তর্বর্তী। কমিশন এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি, কোন গোষ্ঠীকে আসল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময় দুই পক্ষের সাংগঠনিক দাবি, দলীয় সংবিধান, নথি, সমর্থনের পরিমাণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করা হবে।

তাই ‘তৃণমূলের জোড়া ঘাসফুল চিরতরে শেষ’—এমন দাবি এখনই করা তথ্যগতভাবে ঠিক হবে না।

নওশাদ কেন মমতার পাশে?

রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলের বিরোধী হলেও নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্ন সুর শোনা গিয়েছে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর গলায়।

নওশাদ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধী হলেও একটি দলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন না। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর—আজ একটি দলের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা হলে ভবিষ্যতে অন্য দলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ, তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়; বরং নির্বাচন কমিশনের এই অন্তর্বর্তী পদক্ষেপের গণতান্ত্রিক প্রভাব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন নওশাদ।

শুভেন্দুর কটাক্ষ, পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ

অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্ব তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণের হাতিয়ার করেছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-সহ বিজেপি নেতারা তৃণমূলের সাংগঠনিক সংকটকে দলটির অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। আবার তৃণমূল ও বিরোধী শিবির থেকে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অর্থাৎ, বিষয়টি এখন আর শুধু দলীয় প্রতীক নিয়ে আইনি বিবাদে সীমাবদ্ধ নেই—এটি পরিণত হয়েছে বড় রাজনৈতিক সংঘাতে।

আরেক বড় মোড়: নন্দীগ্রামের প্রার্থীই সরে দাঁড়ালেন

এদিকে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়েছে নন্দীগ্রামে।

মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে ১৮ সেপ্টেম্বর নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। এর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে নবান্নে দেখা করেছিলেন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন।

ফলে নির্বাচন কমিশনের প্রতীক বদলের পাশাপাশি নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের সমীকরণও আরও বদলে গেল।

২৮ বছরের ‘জোড়া ঘাসফুল’ কি আবার ফিরবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘জোড়া ঘাসফুল’ দলের নির্বাচনী পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই অভ্যন্তরীণ বিবাদের পর প্রথমবারের মতো দুই গোষ্ঠীকে আলাদা নাম ও প্রতীক নিয়ে ভোটের ময়দানে নামতে হচ্ছে।

তবে বর্তমান সিদ্ধান্ত স্থায়ী প্রতীক বাতিল নয়। নির্বাচন কমিশনের Paragraph 15-এর অধীনে মূল বিবাদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিই ঠিক করবে ভবিষ্যতে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ফুল-ঘাস’ প্রতীকের অধিকার কার হাতে থাকবে।

FACT CHECK

দাবি: তৃণমূলের জোড়া ঘাসফুল প্রতীক চিরতরে বাতিল হয়ে গেছে।
সত্যতা:ভুল/অসম্পূর্ণ। নির্বাচন কমিশন আপাতত নাম ও প্রতীক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।

দাবি: মমতা শিবির নতুন প্রতীক পেয়েছে ফুটবল খেলোয়াড়।
সত্যতা:সঠিক।

দাবি: ঋতব্রত-অরূপ শিবির পেয়েছে খাম।
সত্যতা:সঠিক।

দাবি: নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ঠিক করে দিয়েছে কোন পক্ষ আসল তৃণমূল।
সত্যতা:সঠিক নয়। মূল দলীয় পরিচয় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি।

দাবি: নওশাদ তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করেছেন।
সত্যতা:এভাবে বলা ঠিক নয়। তিনি তৃণমূলের বিরোধী অবস্থান বজায় রেখেই নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করার সিদ্ধান্তের গণতান্ত্রিক প্রভাব নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—‘জোড়া ঘাসফুল’ কার হাতে ফিরবে?

নাকি ২০২৬-এর এই বিভাজনই তৃণমূলের নির্বাচনী পরিচয়ের নতুন অধ্যায়ের শুরু? উত্তর মিলবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে। তার আগে অবশ্য নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ বনাম ‘খাম’—এই অচেনা প্রতীকেই বঙ্গ রাজনীতির নতুন পরীক্ষা হতে চলেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments