ভোটের আগেই কি মমতা শিবিরে একের পর এক ধাক্কা? নন্দীগ্রামে প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর পর রেজিনগরেও তৈরি হয়েছিল একই আশঙ্কা। শনিবার সকালে মনোনয়ন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে গেল ছবি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলার পর সিদ্ধান্ত বদলে ফের নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকার ঘোষণা করেছেন রবিউল। ফলে নন্দীগ্রামের মতো রেজিনগরেও মমতা শিবির প্রার্থীহীন হয়ে গেল—এই খবর এখন আর সঠিক নয়।
তবে শনিবার সকালের ঘটনাক্রম ঘিরে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। কেন হঠাৎ মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রবিউল? নতুন প্রতীক নিয়ে সমস্যা কোথায়? আর প্রশাসনিক চাপ নিয়ে তাঁর অভিযোগের অর্থই বা কী?
সকালে কেন সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন রবিউল?
শনিবার সকালে সংবাদমাধ্যমের সামনে রবিউল আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, দলের কর্মীদের স্বার্থের কথা ভেবেই তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে আসে—নতুন প্রতীক ভোটারদের কাছে দ্রুত পরিচিত করানোর সমস্যা এবং কর্মীদের উপর কথিত প্রশাসনিক হয়রানি বা চাপ।
রবিউলের দাবি ছিল, অনেক কর্মী ভোটের কাজে থাকতে চাইছেন না। এজেন্ট বসানো, সংগঠনকে মাঠে নামানো এবং নতুন প্রতীক ভোটারদের বোঝানো—সবকিছু মিলিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনী লড়াই চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে এগুলি রবিউল আলম চৌধুরীর অভিযোগ ও ব্যাখ্যা। প্রশাসন বা অন্য কোনও পক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনই বলা যায় না।
‘জোড়া ফুল’ নেই, নতুন প্রতীকই কি বড় সমস্যা?
এই ঘটনার পেছনে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর দলীয় পরিচয় নিয়ে বিবাদের মধ্যে কমিশন আপাতত মূল ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং পুরনো প্রতীক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী পেয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক।
নতুন নাম ও প্রতীক নিয়ে ভোটারদের কাছে দ্রুত রাজনৈতিক পরিচয় পৌঁছে দেওয়া কতটা সম্ভব—এই প্রশ্নই রেজিনগরের রবিউলের প্রাথমিক আপত্তির অন্যতম কারণ ছিল।
নন্দীগ্রামে কী ঘটেছিল?
রেজিনগরের নাটকের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ শুক্রবার, নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা করেন। ফলে নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের নিজস্ব প্রার্থী আর থাকেননি।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই নজর চলে যায় রেজিনগরের দিকে।
শনিবার সকালে রবিউলও প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করায় মনে হয়েছিল, দুই উপনির্বাচনেই মমতা শিবিরের নিজস্ব প্রার্থী থাকবেন না।
কিন্তু দুপুরের আগেই সেই হিসাব বদলে যায়।
মমতার সঙ্গে কথা, তারপরই ইউ-টার্ন
রবিউল আলম চৌধুরী পরে জানান, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপরই মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
অর্থাৎ, রেজিনগরে তিনি আপাতত নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকছেন।
ফলে দুই কেন্দ্রের পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ আলাদা।
নন্দীগ্রাম: মমতা শিবিরের নিজস্ব প্রার্থী নেই, কংগ্রেসকে সমর্থন।
রেজিনগর: রবিউল আলম চৌধুরী ফের লড়াইয়ে থাকার কথা জানিয়েছেন।
এই ইউ-টার্নই শনিবারের বঙ্গ রাজনীতির অন্যতম বড় ঘটনা হয়ে উঠেছে।
তাহলে কি ‘বিজেপির চাপে’ প্রার্থীরা সরে যাচ্ছেন?
এখানে সতর্ক থাকা জরুরি।
নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে-র প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘটনা এবং রেজিনগরে রবিউলের সাময়িক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘বিজেপির আতঙ্ক’ বা ‘বিজেপির চাপে আত্মসমর্পণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও সামনে নেই।
রবিউল নিজে প্রশাসনিক চাপ ও কর্মীদের সমস্যার কথা বলেছেন। অন্যদিকে নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে তিনি রাজ্য সরকারের প্রধান সচিবালয় নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে একাধিক রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই সাক্ষাতের সঙ্গে তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সরাসরি কারণ-সম্পর্ক প্রমাণিত নয়।
তাই রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রমাণিত তথ্য—দুটিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
দুই উপনির্বাচনেই কেন এত নাটক?
এই দুই আসনের উপনির্বাচন এমনিতেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিবাদের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন দুই গোষ্ঠীকে আলাদা নাম ও প্রতীক দিয়েছে।
তারপরই নন্দীগ্রামে প্রার্থী প্রত্যাহার, রেজিনগরে প্রত্যাহারের ঘোষণা এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত বদল—সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগেই তৃণমূল শিবিরের নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে সরাসরি দলের ‘পরাজয়’ বা ‘হার স্বীকার’ হিসেবে চিহ্নিত করা এখনও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিষয়, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।
রেজিনগরে এখন কী হতে চলেছে?
রবিউল আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচনে থাকবেন।
অর্থাৎ নতুন প্রতীক নিয়েই তাঁকে ভোটারদের কাছে যেতে হবে। পাশাপাশি অল্প সময়ে সংগঠনকে সক্রিয় করা, বুথ এজেন্ট তৈরি করা এবং ভোটারদের নতুন দলীয় নাম-প্রতীক সম্পর্কে জানানো—এখন তাঁর শিবিরের সামনে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ।
রবিউলের ইউ-টার্নের ফলে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—রেজিনগরের লড়াই শেষ হয়ে যায়নি।
বরং শেষ মুহূর্তের এই নাটক উপনির্বাচনের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিল।
FACT CHECK
দাবি: নন্দীগ্রামের পর রেজিনগরেও মমতার প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
ফ্যাক্ট: ⚠️ আংশিক সত্য, কিন্তু এখন আর বর্তমান নয়। রবিউল সকালে প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছিলেন, পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফের লড়াইয়ে থাকার কথা জানিয়েছেন।
দাবি: রবিউল প্রশাসনিক চাপের কথা বলেছেন।
ফ্যাক্ট: ✅ সঠিক। তিনি কর্মীদের উপর কথিত হয়রানি ও প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ করেছেন এবং নতুন প্রতীক চেনানোর সমস্যার কথাও বলেছেন।
দাবি: বিজেপির চাপে রবিউল সরে গিয়েছিলেন।
ফ্যাক্ট: ❌ নিশ্চিত নয়। রবিউল তাঁর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় প্রশাসনিক চাপ, কর্মীদের সমস্যা এবং নতুন প্রতীক নিয়ে অসুবিধার কথা বলেছেন; ‘বিজেপির চাপে’ সরে যাওয়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
দাবি: দুই কেন্দ্রেই মমতা শিবির প্রার্থীহীন।
ফ্যাক্ট: ❌ বর্তমানে ভুল। নন্দীগ্রামে নিজস্ব প্রার্থী নেই, কিন্তু রেজিনগরে রবিউল আলম চৌধুরী ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা “রেজিনগরেও কি মমতার প্রার্থী ময়দান ছাড়লেন?” নয়।
বরং বড় প্রশ্ন—নতুন নাম, নতুন প্রতীক এবং নন্দীগ্রামের ধাক্কার পর রেজিনগরে রবিউলের এই ইউ-টার্ন মমতা শিবিরকে কতটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে?
৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের আগে সেই উত্তরই এখন বঙ্গ রাজনীতির অন্যতম নজরকাড়া বিষয়।



