Tuesday, October 13, 2026
Google search engine
Homeসিনেদুনিয়াবলি দুনিয়াচলে গেলেন নানা পটেকর! ৭৫-এ থামল ভারতীয় সিনেমার এক শক্তিশালী কণ্ঠ

চলে গেলেন নানা পটেকর! ৭৫-এ থামল ভারতীয় সিনেমার এক শক্তিশালী কণ্ঠ

চলে গেলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পটেকর। ৭৫ বছর বয়সে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া আচমকা বন্ধ হয়ে মৃত্যু হল ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতার। বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ভোরে গোয়ার ডোনা পাওলার বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।

হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে CPR দিয়ে অভিনেতাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু তাতে সাড়া দেননি তিনি। ভোর প্রায় ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

ভোররাতে আচমকাই অসুস্থ নানা

নানা পটেকরের ছেলে মালহার পটেকার তাঁর বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। জানা যাচ্ছে, অসুস্থ বোধ করার পর চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।

এরপর একটি মেডিক্যাল টিম দ্রুত তাঁর গোয়ার বাড়িতে পৌঁছয়। সেখানে তাঁকে অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া যায়। চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে তাঁকে সিপিআর দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। পরে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

The Indian Express-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোররাত প্রায় ২টা ৩০ মিনিট নাগাদ নানা এক বন্ধুকে অসুস্থ বোধ করার কথা মেসেজ করেছিলেন। ওই বন্ধু পরে প্রায় ৪টার দিকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছন এবং তাঁকে ঘামতে ও শ্বাসকষ্টে ভুগতে দেখেন বলে জানা গিয়েছে।

অর্থাৎ, অসুস্থ হওয়ার পর খুব বেশি সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে যায়।

৪৫ মিনিট ধরে চলেছিল CPR

নানা পটেকরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরও চিকিৎসকেরা হাল ছাড়েননি।

প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে CPR দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। হাসপাতাল সূত্রে পরে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে cardiac arrest-এর কথা জানানো হয়।

এখানে “হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু” এবং “cardiac arrest”—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। cardiac arrest হল এমন একটি জরুরি অবস্থা যেখানে হৃদ্‌যন্ত্র কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। নানার ক্ষেত্রে হাসপাতাল সূত্রে এটিকেই মৃত্যুর কারণ বলা হয়েছে।

মাত্র কয়েকদিন আগেও ছিলেন অনুষ্ঠানে

নানার মৃত্যুর খবর আরও আবেগঘন হয়ে উঠেছে কারণ মাত্র চার দিন আগেও তাঁকে গোয়ার একটি অনুষ্ঠানে হাসতে, স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে নাচতে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজানোর চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছিল।

৪ অক্টোবরের সেই অনুষ্ঠানে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতির ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে।

সেই অনুষ্ঠানেই মৃত্যুর কয়েকদিন আগে জীবন নিয়ে নানা বলেছিলেন, প্রত্যেক মানুষকেই একদিন চলে যেতে হবে এবং আগামীকাল তিনি থাকবেন কি না, সেটাও কেউ জানেন না। তাঁর মৃত্যুর পর সেই কথাগুলিই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

‘নানা’ নামে পরিচিত হলেও আসল নাম বিশ্বনাথ

নানা পটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম তাঁর।

থিয়েটার দিয়ে অভিনয়ের যাত্রা শুরু করার পর ১৯৭৮ সালের ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে হিন্দি ও মরাঠি সিনেমায় নিজের আলাদা অভিনয়ভাষা তৈরি করেন।

তাঁর অভিনয়ে ছিল সংলাপের তীব্রতা, চোখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের ভিতরের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা।

‘পরিন্দা’ থেকে ‘ক্রান্তিবীর’—একাধিক জাতীয় পুরস্কার

নানা পটেকরের অভিনয়জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছবি ‘পরিন্দা’। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান।

এরপর ‘ক্রান্তিবীর’ ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় জাতীয় পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান। ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘ওয়েলকাম’, ‘রাজনীতি’, ‘নটসম্রাট’-এর মতো ছবিতেও তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়।

একদিকে যেমন তিনি ‘ক্রান্তিবীর’-এর মতো ছবিতে তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠির মতো চরিত্রে তাঁর কমেডি টাইমিংও নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে।

অভিনেতার পাশাপাশি পরিচালকও ছিলেন

শুধু অভিনয়েই থেমে থাকেননি নানা পটেকর।

‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন তিনি। সেনাবাহিনী ও সমাজের কঠিন বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ছবি তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্য একটি দিক সামনে এনেছিল।

থিয়েটার, মরাঠি ও হিন্দি সিনেমা—তিন ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন তিনি।

পদ্মশ্রীতেও সম্মানিত হয়েছিল তাঁর অবদান

ভারতীয় সিনেমা ও শিল্পকলায় তাঁর দীর্ঘ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে পদ্মশ্রী সম্মান পান নানা পটেকর। জাতীয় পুরস্কারসহ একাধিক সম্মানে তাঁর অভিনয়জীবন সমৃদ্ধ হয়েছে।

তবে পুরস্কারের তালিকার বাইরেও ভারতীয় সিনেমায় তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর অভিনয়ের স্বতন্ত্রতা।

তিনি এমন একজন অভিনেতা ছিলেন, যাঁকে পর্দায় দেখলে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।

শেষ হল প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়যাত্রা

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত নানা পটেকর অভিনয় করে গিয়েছেন। গুরুগম্ভীর চরিত্র থেকে কমেডি—বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় নিজের ছাপ রেখে গিয়েছেন তিনি।

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর আচমকা তাঁর প্রয়াণে শেষ হল সেই দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা।

নানা পটেকরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই চলচ্চিত্র জগতে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। মহারাষ্ট্র সরকারও তাঁর অবদানের স্বীকৃতিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্যের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

একসময় যে কণ্ঠে পর্দায় সংলাপ শুনে দর্শক শিহরিত হয়েছেন, যে চোখের অভিব্যক্তি দিয়ে নানা অসংখ্য চরিত্রকে জীবন্ত করেছেন—সেই শিল্পীর অভিনয় আর নতুন করে দেখা যাবে না।

তবে তাঁর তৈরি চরিত্রগুলি থেকে যাবে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে।

নানা পটেকর নেই, কিন্তু তাঁর অভিনয়ের তীব্রতা, তাঁর কণ্ঠস্বর এবং তাঁর তৈরি অসংখ্য চরিত্র—দর্শকের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে বহুদিন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments