পর্দায় কখনও কঠোর পুলিশ অফিসার, কখনও প্রতিবাদী যুবক, আবার কখনও এমন এক চরিত্র—যার চোখের ভাষাই বলে দেয় হাজার কথা। নানা পাটেকরকে দর্শক চেনেন তাঁর শক্তিশালী অভিনয়, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর এবং বাস্তবধর্মী চরিত্রের জন্য। কিন্তু ক্যামেরার বাইরে এই অভিনেতার জীবনের আরেকটি দিকও বহুবার আলোচনায় এসেছে—কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, সমাজসেবায় যুক্ত থাকা এবং জাঁকজমকের বদলে সাধারণ জীবনযাপনের প্রতি তাঁর টান।
তাঁর উপার্জনের ৯০ শতাংশই নাকি অসহায় মানুষের জন্য বিলিয়ে দিতেন—এমন দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু এই নির্দিষ্ট হিসাবের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ স্পষ্ট নয়। তবে মহারাষ্ট্রের কৃষক ও খরাপীড়িত মানুষের জন্য তাঁর উদ্যোগ এবং ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর কাজ তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দেয়।
‘বিশু’ থেকে নানা পাটেকর: নামের পিছনে রয়েছে শৈশবের গল্প
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জাঞ্জিরায় জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বনাথ গজানন পাটেকর। সিনেমার জগতে অবশ্য তিনি পরিচিত হন ‘নানা পাটেকর’ নামে। ছোটবেলায় তাঁর মায়ের এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী স্নেহ করে তাঁকে ‘নানা’ বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে সেই ডাকনামই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের অংশ।
তবে তাঁর সাফল্যের গল্পের শুরুটা ছিল না কোনও বিলাসবহুল জীবনে। পারিবারিক আর্থিক সমস্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। জীবনের শুরুর দিকেই কাজের অভিজ্ঞতা, অর্থকষ্ট এবং কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অল্প বয়সে সিনেমার পোস্টার আঁকা এবং অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
পোস্টার আঁকার কাজ থেকে জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবন গড়ে উঠেছিল থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৮ সালে গমন ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীকালে একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেন তিনি।
পরিন্দা, ক্রান্তিবীর, অগ্নিসাক্ষী, খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল, আব তক ছাপ্পান, ওয়েলকাম এবং নটসম্রাট—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। গম্ভীর চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও তিনি দেখিয়েছেন নিজের দক্ষতা।
অভিনয়ের জন্য একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন নানা পাটেকর। ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত করা হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক ছবির মাধ্যমে পরিচালনার কাজেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি।
কেন কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নানা পাটেকর?
খ্যাতি ও সাফল্যের পাশাপাশি কৃষকদের দুর্দশা নানা পাটেকরের সামাজিক কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। মহারাষ্ট্রে খরা, ঋণের চাপ এবং কৃষক পরিবারের আর্থিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ থেকেই তাঁর উদ্যোগের কথা সামনে আসে।
২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। প্রাথমিকভাবে কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সাহায্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন ধরনের সহায়তামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় এই সংস্থা।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই যে, সাহায্যকে শুধু ব্যক্তিগত অনুদানে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। নানা পাটেকরের পরিচিতির বাইরে তাঁর এই সামাজিক ভূমিকা তাই আলাদা করে উল্লেখযোগ্য।
উপার্জনের ৯০ শতাংশ দান—দাবিটির সত্যতা কতটা?
নানা পাটেকর নিজের উপার্জনের ৯০ শতাংশ অসহায় মানুষদের দিয়ে দিতেন—এই দাবি আবেগ তৈরি করলেও নির্দিষ্ট অনুপাতটি নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না।
তবে কৃষকদের জন্য তাঁর উদ্যোগ, ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁর মানবিক কাজের কথা বলতে গেলে তাই যাচাই করা তথ্যের উপর নির্ভর করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিলাসবহুল জীবন নয়, সাধারণ জীবনযাপনের প্রতি টান
তারকাদের জীবন মানেই দামি গাড়ি, বড় বাড়ি এবং বিলাসিতা—এমন ধারণার সঙ্গে নানা পাটেকরের জীবনযাপনের কিছু দিক মেলে না। তাঁর কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ, নিজের খামারবাড়িতে সময় কাটানো এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকার অভ্যাস নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পুণের ডোঞ্জে গ্রামের খামারবাড়িতে তিনি চাষবাস করতেন, এমনকি সেখানে কাজ করা মানুষদের জন্য রান্নাও করতেন বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
অটোরিকশায় যাতায়াত বা দামি গাড়ি না কেনার গল্প তাঁর সরল জীবনযাপনের আলোচনায় মাঝেমধ্যে উঠে আসে। তবে প্রতিটি ঘটনার নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট যাচাই না করে সেগুলিকে তাঁর জীবনের অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে দেখানো উচিত নয়।
পর্দার নায়ক থেকে বাস্তবের সামাজিক কর্মী
নানা পাটেকরের জীবনকে শুধু সিনেমার সাফল্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শৈশবের আর্থিক টানাপোড়েন থেকে অভিনয়ের জগতে প্রতিষ্ঠা, আর সেই পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে কৃষক ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন একাধিক মাত্রায় বিস্তৃত।
তাঁর জীবনের প্রতিটি জনপ্রিয় গল্পের সত্যতা এক রকম নয়। কিছু ঘটনা নথিভুক্ত, কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, আবার কিছু দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। সেই পার্থক্য মাথায় রেখেই তাঁর জীবন ও কাজকে দেখা প্রয়োজন।
অভিনেতা হিসেবে নানা পাটেকর যে ছাপ রেখে গিয়েছেন, তা তাঁর চরিত্র ও সংলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য তাঁর উদ্যোগও তাঁর জীবনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।



