বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিতে আচমকাই তৈরি হল নতুন চর্চা। কারণ একটাই—বর্ষীয়ান অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে হঠাৎ হাজির হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে শুধু সৌজন্য নয়, ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি চিঠি এবং রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের বিস্তারিত রিপোর্ট কার্ড। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এটি কি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় কোনও রাজনৈতিক সমীকরণ?
বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম দাপুটে অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক বহু বছর ধরেই রাজনীতির বাইরে থেকেছেন। কিন্তু ভোটের মুখে তাঁর বাড়িতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপস্থিতি রাজ্য রাজনীতিকে নতুন করে উষ্ণ করে তুলেছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন—তাহলে কি এবার ভোটের ময়দানে নামছেন রঞ্জিতবাবু? নাকি কোনও বিশেষ ভূমিকার ইঙ্গিত মিলল এই সাক্ষাতে?
কী উদ্দেশ্যে রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে অভিষেক?
জানা গিয়েছে, তৃণমূলের ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছন গল্ফ ক্লাব রোডে রঞ্জিত মল্লিকের বাসভবনে। তুঁতে রঙের পাঞ্জাবি পরে অভিনেতার বাড়িতে যান তিনি। উপস্থিত ছিলেন রঞ্জিত মল্লিকের স্ত্রী দীপা মল্লিকও। সাক্ষাৎপর্বে মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক এবং তাঁর স্বামী, প্রযোজক নিসপাল সিংয়ের উপস্থিতির কথাও জানা গিয়েছে।
এই বৈঠকে রঞ্জিত মল্লিকের হাতে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বিস্তারিত রিপোর্ট কার্ড তুলে দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, পরিকাঠামো, পর্যটন এবং কৃষি—এই সমস্ত ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের কাজের খতিয়ান তুলে ধরা হয় ওই রিপোর্টে।
“রঞ্জিত মল্লিক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস” — অভিষেক
বাড়ির বাইরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রঞ্জিত মল্লিককে নিয়ে প্রশংসায় ভরিয়ে দেন। তিনি বলেন,
“ওঁর অভিনীত বহু সিনেমা আমার জন্মের আগেই মুক্তি পেয়েছিল। তবুও সেগুলো আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখে। বাংলা চলচ্চিত্রে ওঁর অবদান আগামী বহু শতাব্দী ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
এই মন্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে—এটি কি শুধুই সৌজন্যমূলক প্রশংসা, নাকি ভবিষ্যতের কোনও রূপরেখার ইঙ্গিত?
কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুললেন অভিষেক
এই সাক্ষাতের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগও তোলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। অভিষেকের দাবি,
গত পাঁচ বছরে রাজ্য সরকার প্রবল আর্থিক চাপের মধ্যে কাজ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির মাধ্যমে বাংলার উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকার রাজ্যের প্রাপ্য তহবিল আটকে রাখা হয়েছে।
তবে সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্প রাজ্যজুড়ে সফলভাবে চালু রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রঞ্জিত মল্লিক কি রাজনীতিতে আসছেন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সাক্ষাৎ কি রঞ্জিত মল্লিকের সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের ইঙ্গিত? আপাতত তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য না করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই বৈঠক নিছক কাকতালীয় নয়। জনপ্রিয় মুখকে সামনে রেখে ভোটের আগে জনসংযোগ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই এই সাক্ষাৎকে দেখছেন অনেকেই।
অন্যদিকে, রঞ্জিত মল্লিকের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি—তিনি এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগতভাবে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন এবং তাঁর নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে আগ্রহী—এ কথা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
রাজনীতির সঙ্গে সেলেব্রিটি সমীকরণ
বাংলার রাজনীতিতে তারকা মুখের ভূমিকা নতুন নয়। অতীতে বহু অভিনেতা ও অভিনেত্রী ভোটের ময়দানে নেমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেই তালিকায় কি তবে নাম লেখাতে চলেছেন রঞ্জিত মল্লিক? নাকি তিনি শুধুই একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে মতামত জানালেন?
সব মিলিয়ে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও রঞ্জিত মল্লিকের এই সাক্ষাৎ রাজ্য রাজনীতিতে যে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ভবিষ্যতে এই বৈঠকের রেশ কতদূর গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।



