একদিকে ফুটবল মাঠে গোলের লড়াই, অন্যদিকে রাজনৈতিক ময়দানে ক্ষমতার হিসেব—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়েই আবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন বীরভূম জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের কোর কমিটির আহ্বায়ক অনুব্রত মণ্ডল। বোলপুরের ডাকবাংলো মাঠে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর মুখে ফের শোনা গেল বহু আলোচিত রাজনৈতিক স্লোগান—“খেলা হবে”। আর তাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল, অনুষ্ঠানটি শুধুই খেলাধুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে রাজনীতির ময়দানেও।
ফুটবল টুর্নামেন্টের মঞ্চে রাজনৈতিক বার্তা
বোলপুর ডাকবাংলো মাঠে আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন অনুব্রত মণ্ডল সহ স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব ও ক্রীড়াপ্রেমীরা। আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাধুলোর সূচনা হলেও অনুব্রত মণ্ডলের বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আজ থেকে খেলা শুরু হলো।” এই একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু করার জন্য।
যদিও পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এই খেলা আর ওই খেলা এক নয়।” অর্থাৎ ফুটবল মাঠের খেলা আর রাজনৈতিক লড়াইকে আলাদা করে দেখার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তাতেও জল্পনা থামেনি। কারণ, ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিছক কোনও শব্দবন্ধ নয়—এটি ইতিমধ্যেই শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

‘খেলা হবে’—শুধু স্লোগান নয়, রাজনৈতিক ইঙ্গিত
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকে ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। অনুব্রত মণ্ডলের মুখে এই শব্দবন্ধ ফের শোনা যাওয়ায় অনেকেই মনে করছেন, আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য কর্মী-সমর্থকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতেই এই বার্তা।
অনুব্রতবাবু তাঁর বক্তব্যে খেলাধুলোর প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদের উদ্দেশে কটাক্ষ করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, যেমন ফুটবল মাঠে গোল করার জন্য লড়াই চলে, তেমনই রাজনীতির ময়দানে চলে ক্ষমতা দখলের লড়াই। তাঁর কথায় স্পষ্ট, সংগঠন এবং প্রস্তুতির দিক থেকে তৃণমূল কংগ্রেস যে তৈরি, সেই বার্তাই তিনি দিতে চেয়েছেন।
অনুব্রত মণ্ডল নিজে কি নামবেন ‘খেলা’-য়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—এই ‘খেলা’-য় অনুব্রত মণ্ডল নিজে কতটা সক্রিয় ভূমিকা নেবেন? এই প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর দেননি তিনি। বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর বক্তব্যেই অনেক ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে। অনুব্রত মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই বীরভূমের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী নাম। ফলে তাঁর প্রতিটি মন্তব্যই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তৃণমূল শিবিরের অন্দরে তাঁর এই বক্তব্যে যেমন কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে, তেমনই বিরোধী শিবিরে তৈরি হয়েছে অস্বস্তি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মাঠে ফুটবল টুর্নামেন্ট হলেও আসল লক্ষ্য ছিল সংগঠনকে চাঙ্গা করা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তা দেওয়া।

খেলাধুলোর আড়ালে রাজনৈতিক প্রস্তুতি?
ডাকবাংলো মাঠের এই অনুষ্ঠান ঘিরে অনেকেই মনে করছেন, খেলাধুলোর আয়োজনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। একদিকে খেলাধুলোর মাধ্যমে যুবসমাজকে যুক্ত রাখা, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে কর্মীদের উজ্জীবিত করা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই বার্তা দিতে চেয়েছেন অনুব্রত মণ্ডল।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের কর্মসূচি আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। কারণ, খেলাধুলোর মঞ্চ তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত হলেও সেখানে দেওয়া রাজনৈতিক ইঙ্গিত সহজেই মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

রাজনীতির ময়দানে কি আবার উত্তাপ?
ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন দিয়ে শুরু হলেও, এই অনুষ্ঠান যেন ইঙ্গিত দিয়ে গেল—রাজনীতির ময়দানেও প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। অনুব্রত মণ্ডলের ‘খেলা হবে’ মন্তব্য নিছক কাকতালীয় নয় বলেই মনে করছেন অনেকেই। বীরভূমের রাজনীতিতে এই বক্তব্য কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।
তবে একথা নিশ্চিত, ডাকবাংলো মাঠে সেদিন শুধু ফুটবল খেলা শুরু হয়নি—রাজনৈতিক লড়াইয়ের আবহও যেন নতুন করে তৈরি হয়ে গেল।



