Babri Masjid History and Ram Mandir Verdict : ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানের নাম বাবরি মসজিদ। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে এই স্থাপনাকে ঘিরে যে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আইনগত টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তা আজও রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। ১৫২৮ সালে মোগল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকী যে মসজিদ নির্মাণ করেন, পরে সেটিই হয়ে ওঠে দেশের বহু বড় ঘটনাবলির কেন্দ্রবিন্দু।
৫০০ বছরের বেশি পুরনো ইতিহাস
অযোধ্যার এই মসজিদটি ১৫২৮–১৫২৯ সালের মধ্যে নির্মিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি একটি সাধারণ ধর্মীয় উপাসনাস্থল হিসেবে পরিচিত থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এক নতুন বিতর্কের জন্ম হয়। কিছু হিন্দু সংগঠন দাবি করে, এই স্থানের নিচেই নাকি ভগবান রামচন্দ্রের জন্মস্থান ছিল এবং মসজিদ নির্মাণের আগে এখানে একটি মন্দির ছিল। এই দাবিকে সামনে রেখেই ধীরে ধীরে সংঘাত, রাজনীতি এবং জনআন্দোলনের সূচনা হয়।

১৮৫৮ সালে শিখদের দাবি – বিতর্কের নতুন বাঁক
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নিহঙ্গ শিখদের একটি দল দাবি তোলে যে বাবরি মসজিদের স্থানে রামের জন্মস্থান ছিল। এই দাবির পর থেকেই ধর্মীয় উত্তেজনার পরিবেশ আরও বেড়ে যায়। যদিও তখনও বড় কোনও সংঘাত না হলেও, ভবিষ্যতের ইস্যুগুলোর বীজ এই সময়ই বপন হয়।
১৮৮৫: প্রথম আইনি মামলা
১৮৮৫ সালে নিমহরি আখড়ার পুরোহিত রঘুবীর দাস আদালতের দ্বারস্থ হন এবং মসজিদের লাগোয়া স্থানে একটি মন্দির নির্মাণের অনুমতি চান। ব্রিটিশ শাসকরা এই দাবি খারিজ করে দিয়ে এলাকা দু’ভাগে বিভক্ত করতে কাঁটাতারের বেড়া বসায়। দু’পক্ষের মানুষ যাতে আলাদা ভাবে প্রার্থনা করতে পারে, সে ব্যবস্থা বজায় থাকে দীর্ঘ ৯০ বছর।
১৯৪৯: প্রথমবার মসজিদের ভেতরে রামের মূর্তি
১৯৪৯ সালে হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে, বাবরি মসজিদের ভেতরে রামলালার মূর্তি দেখা গেছে। কেউ দাবি করেন মূর্তিটি “নিজে থেকেই” প্রকাশিত হয়েছে, আবার কেউ বলেন এটি কারও পরিকল্পিত কাজ। এই ঘটনাই প্রথমবার বড় সংঘাতের সূচনা করে এবং প্রশাসন মসজিদটি তালাবদ্ধ করে দেয়।

১৯৯২: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট
৬ ডিসেম্বর ১৯৯২—এই দিনটি ভারতীয় ইতিহাসে কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত। বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা অযোধ্যায় সমবেত হয়ে বাবরি মসজিদ ভেঙে দেয়। ঘটনার পর কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে অশান্তি, দাঙ্গা, হতাহত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। এই ধ্বংসের পরই আদালত ও তদন্ত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে আইনি লড়াই আরও তীব্রতর হয়।
২০০২ থেকে ২০১০: আদালতের দৌড়ঝাঁপ ও ASI-এর রিপোর্ট
এই দশকে বাবরি বিরোধ নিয়ে একাধিক মামলার শুনানি হয়। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) তদন্ত করে জানায়, মসজিদের নীচে নাকি একটি প্রাচীন স্থাপনার চিহ্ন পাওয়া গেছে। যদিও এটি নিয়ে বহু বিতর্ক থাকলেও আদালতে রিপোর্টটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেয়—বিতর্কিত জমি তিন ভাগে ভাগ হবে, তিনটি পক্ষের মধ্যে সমান ভাগে।
২০১৯: সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মত রায় ঘোষণা করে—
- বিতর্কিত জমিতে রাম মন্দির নির্মাণ করা যাবে
- মুসলিম সমাজের জন্য অন্যত্র ৫ একর জমি বরাদ্দ করা হবে মসজিদ নির্মাণের জন্য
এরপরই রাম মন্দির নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হয়।

২০২০: রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন
৫ আগস্ট ২০২০—দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অযোধ্যায় রাম মন্দিরের ভূমিপুজো করেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে উৎসবের পরিবেশ দেখা যায়।
২০২৪: রামলালার ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’
২২ জানুয়ারি ২০২৪—অযোধ্যায় নতুন রাম মন্দির উদ্বোধন হয় এবং রামলালার কষ্টিপাথরের মূর্তির ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ সম্পন্ন হয়। সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ টিভি, সামাজিক মাধ্যম ও সরাসরি অনুষ্ঠান দেখে ইতিহাসের সাক্ষী হন।
এই ঘটনার পর বাবরি মসজিদের বিতর্ক কার্যত নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে এবং মসজিদ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ জমিতে নির্মাণপ্রক্রিয়া এগোতে থাকে।



