নতুন বছরের প্রাক্কালে ফের এক মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনায় শোকস্তব্ধ উত্তরবঙ্গ। সাতসকালেই ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারালেন এক গৃহবধূ। ঘটনাটি ঘটেছে জলপাইগুড়ি জেলার বানারহাট ব্লকের অন্তর্গত ক্ষুদিরাম পল্লী এলাকায়। মৃত মহিলার নাম জাবেদা বিবি (৪৬)। ইংরেজি বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আগমুহূর্তে এই দুর্ঘটনা গোটা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে বানারহাট এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘন কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল। ভোরের আলো থাকলেও দৃশ্যমানতা ছিল অত্যন্ত কম। ঠিক সেই সময়ই প্রতিদিনের মতো ঘরের নোংরা আবর্জনা ফেলার জন্য বাড়ি থেকে বের হন জাবেদা বিবি। আবর্জনা ফেলার পর রেললাইন পার হয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই সময়ই ঘটে যায় বিপত্তি। সকাল আনুমানিক ৭টা ২২ মিনিট নাগাদ ধুবড়িগামী একটি ডোমো ট্রেন দ্রুতগতিতে ওই রেলপথ ধরে যাচ্ছিল। ঘন কুয়াশার কারণে ট্রেনটি আসছে—তা বুঝে ওঠার আগেই লাইনের উপর চলে আসেন জাবেদা বিবি। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ধাক্কার অভিঘাত এতটাই প্রবল ছিল যে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। ট্রেন চালকও কুয়াশার কারণে সময়মতো তাঁকে দেখতে পাননি বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
দুর্ঘটনার পর ট্রেনের শব্দ ও চিৎকার শুনে আশপাশের বাসিন্দারা ছুটে আসেন। রেললাইনের পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দ্রুত খবর দেওয়া হয় বানারহাট থানার পুলিশ ও জিআরপিকে।
খবর পেয়ে পুলিশ এবং জিআরপি ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক তদন্তের পর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। রেল কর্তৃপক্ষের তরফেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শোকস্তব্ধ পরিবার ও এলাকা
জাবেদা বিবির আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে তাঁর পরিবার। স্থানীয়দের মতে, তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও পরিশ্রমী মহিলা ছিলেন। প্রতিদিনের মতোই সেদিন সকালে ঘরের কাজ সেরে বাইরে বেরিয়েছিলেন। কেউ ভাবতেও পারেনি, সেটাই হবে তাঁর জীবনের শেষ সকাল।
নতুন বছরের উৎসবের আবহের মাঝেই এই দুর্ঘটনায় এলাকায় আনন্দের বদলে নেমে এসেছে শোক ও স্তব্ধতা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—রেললাইন সংলগ্ন বসতিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ আছে কি না।
কুয়াশা ও রেল দুর্ঘটনা: পুরনো সমস্যা নতুন করে সামনে
শীতের মরশুমে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘন কুয়াশা একটি পরিচিত সমস্যা। প্রতিবছরই কুয়াশার কারণে সড়ক ও রেল দুর্ঘটনার খবর সামনে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৃশ্যমানতা কমে গেলে রেললাইন পারাপারের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, ক্ষুদিরাম পল্লী এলাকায় রেললাইন পারাপারের জন্য কোনও সাবওয়ে বা ওভারব্রিজ নেই। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে লাইন পার হতে হয়। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা হোক।
প্রশাসনের কাছে এলাকাবাসীর দাবি
এই দুর্ঘটনার পর ফের একবার রেললাইন সংলগ্ন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি—
- কুয়াশার সময় ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
- বসতিপূর্ণ এলাকায় রেললাইন পারাপারের জন্য সাবওয়ে বা ফুট ওভারব্রিজ
- সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও শব্দসংকেত ব্যবস্থা জোরদার করা
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত রিপোর্ট হাতে এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইংরেজি বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের ঠিক আগে এই দুর্ঘটনা যেন মনে করিয়ে দিল—এক মুহূর্তের অসতর্কতা বা অব্যবস্থা কত বড় মূল্য চুকিয়ে দিতে বাধ্য করতে পারে। জাবেদা বিবির মৃত্যু শুধুই একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং রেললাইন সংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে নতুন করে তাকানোর বার্তা দিচ্ছে।



