Bangladesh Economy : দেনার দায়ে ক্রমশ জর্জরিত হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে চিনের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণ এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে ওষুধ—এক সময় যেসব মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্যের জোগান নিয়ে বাংলাদেশ তুলনামূলক স্বস্তিতে ছিল, সেখানেই এখন বাড়ছে চাপ। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান দায় দেশের আর্থিক ভারসাম্যকে নড়বড়ে করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতি অনেকের কাছেই শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। শ্রীলঙ্কা যেভাবে চিনের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে ঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ঋণের ফাঁদে পড়েছিল, বাংলাদেশও নাকি ধীরে ধীরে সেই একই পথে এগোচ্ছে—এমনই আশঙ্কার কথা উঠে আসছে একাধিক প্রতিবেদনে।
শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যম Asian News Post–এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সংকটকালীন অবস্থার মিল ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের বোঝা সামলাতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এম. আব্দুর রহমান খান নিজেও ঋণের চাপের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে খবর। অন্যদিকে, ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-র এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থ সচিব এম. খায়রুজ্জামান মজুমদারকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার চলতি অর্থবর্ষের জাতীয় বাজেট আগের বছরের তুলনায় কম রাখা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি স্পষ্টতই আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৪২ শতাংশ বেড়েছে। এই ঋণের বড় অংশই নেওয়া হয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যান্য বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। তবে সেই প্রকল্পগুলি প্রত্যাশিত হারে আয় দিতে না পারায় এখন ঋণ পরিশোধ করাই হয়ে উঠছে সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে ঋণ শোধ করতে। রিপোর্ট বলছে, বেতন ও পেনশন খাতের পরেই ঋণ পরিশোধ এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজেট ব্যয়। এর ফলে শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাতও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে এই অনুপাত ছিল প্রায় ৩৪ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে ৩৯ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই হার আরও বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বিপদের মুখে পড়তে পারে।
সম্প্রতি এক সেমিনারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এক সময় বেতন ও পেনশনের পরেই কৃষি ও শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি খরচ হত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলিতে বরাদ্দ কমছে, যা ভবিষ্যতের জন্য মোটেই শুভ লক্ষণ নয়।
এদিকে, এনটিভি-র এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের International Debt Report 2025 অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এখন দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৯২ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, ঋণ পরিশোধে খরচ হচ্ছে রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ঋণ শোধ করতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, যদি সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব না হয়, তাহলে চিন কী ধরনের কৌশল নিতে পারে। শ্রীলঙ্কার উদাহরণে দেখা গেছে, ঋণ শোধ করতে না পারায় গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে চিনের হাতে চলে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চলেছে?
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ঋণের বোঝা সামলে উন্নয়নের গতি বজায় রাখা সরকারের কাছে এক কঠিন পরীক্ষার মতো। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি আরও গভীর সমস্যায় পড়তে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।



