India Bangladesh Cricket Controversy : বিশ্ব ক্রিকেটে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক বাস্তব সত্য— ক্রিকেট আর শুধু ২২ গজের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে রাজনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ। ঠিক এই আবহেই ভারতকে কেন্দ্র করে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে একই সুরে কথা বলছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। বিষয়টি শুধু ক্রিকেটীয় নয়, বরং এর প্রভাব পড়তে পারে গোটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাঠামোর উপর।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মুহূর্ত, ঠিক তখনই সামনে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB) নাকি সরাসরি আইসিসিকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। শুধু তাই নয়, সেই চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে আইসিসির বোর্ড সদস্যদের কাছেও। ক্রিকেট মহলে প্রশ্ন উঠছে— এটি কি শুধুই নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, নাকি ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ তৈরির চেষ্টা?
কী লেখা ছিল পাকিস্তানের চিঠিতে?
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে, প্রতিবেশী অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতে গিয়ে ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশের অনীহাকে তারা যৌক্তিক বলেই মনে করছে। পিসিবির মতে, কোনও দেশের খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত, এবং সেই দিকটি মাথায় রেখেই বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন জানানো হয়েছে।
এই চিঠি পৌঁছানোর পরেই আইসিসি বুধবার একটি জরুরি বোর্ড মিটিং ডাকে। সেই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল— বাংলাদেশের ম্যাচগুলি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোনও দেশে, বিশেষত শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা সম্ভব কি না।
আইসিসির অবস্থান কী?
আইসিসি এই মুহূর্তে সূচি বদলের পক্ষে নয় বলেই স্পষ্ট করেছে। সংস্থার বক্তব্য, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ভারত ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে আয়োজন করছে এবং আগেই নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতের ভেন্যুগুলিতে ম্যাচ আয়োজনের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন। হঠাৎ করে সূচি বদলানো হলে তা শুধুমাত্র লজিস্টিক সমস্যাই নয়, বরং টুর্নামেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
আইসিসি আরও জানায়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার বৈঠক ও প্রস্তাব এলেও এই মুহূর্তে ভারতের বাইরে ম্যাচ সরানোর কোনও বাস্তবসম্মত কারণ তারা দেখছে না।
এই বিতর্কের সূত্রপাত কোথা থেকে?
এই উত্তেজনার সূত্রপাত হঠাৎ করে হয়নি। সবকিছুর শুরু আইপিএল ২০২৬-কে কেন্দ্র করে। বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে না রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর পরপরই একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ।
প্রথমে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করা হয়। তারপর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তাদের দল নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে আগ্রহী নয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন বাংলাদেশের একাংশ ক্রিকেটার বিপিএল বয়কটের ইঙ্গিত দেন।
এই পুরো প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান প্রকাশ্যে কিছু না বললেও, আইসিসিকে লেখা চিঠির মাধ্যমে তাদের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা: নতুন সমীকরণ?
ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এমন প্রকাশ্য সমর্থন খুব একটা দেখা যায়নি। তাই এই ঘটনা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক ঠেকছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি কেবল খেলাধুলার বিষয় নয়। বরং এই সুযোগে ভারতের প্রভাব ও কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর চেষ্টা করছে দুই দেশ।
তবে প্রশ্ন উঠছেই— ভারতীয় ক্রিকেট কি এত সহজে চাপে পড়ে সিদ্ধান্ত বদলাবে? বিসিসিআই ও আইসিসি, দুই সংস্থাই বরাবরই কড়া অবস্থান নেয় নিয়ম ও সূচি নিয়ে। ফলে শুধু রাজনৈতিক চাপ বা চিঠির ভিত্তিতে ভারতের অবস্থান বদলানো আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে খেলবে কি না, ম্যাচের ভেন্যু বদলাবে কি না, কিংবা কোনও বিকল্প দল সুযোগ পাবে কি না— সবকিছুই নির্ভর করছে আইসিসির পরবর্তী ঘোষণার উপর।
একটা বিষয় অবশ্য পরিষ্কার— এই বিতর্ক শুধু একটি দলের অংশগ্রহণ নয়, বরং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রাজনীতি ও কূটনীতির প্রভাব কতটা বাড়বে, তারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ক্রিকেট কি এখনও শুধুই ক্রিকেট? নাকি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠছে এই খেলাটাও? উত্তর দেবে সময়, আর তার আগে তাকিয়ে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব।



