মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব এখন ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়তে শুরু করেছে। তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ব্যাঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় অনেক দেশই নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপের মুখে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ Bangladesh।
জানা গেছে, জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কা মোকাবিলা করতে ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের আবেদন জানিয়েছে ঢাকা। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে দুই দেশের প্রশাসনিক স্তরে।
ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেলের আবেদন
সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা Bangladesh Petroleum Corporation ভারতের কাছে অতিরিক্ত ৫,০০০ টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে।
এই ডিজেল সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম হল দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্প India-Bangladesh Friendship Pipeline।
এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের অসম রাজ্যের Numaligarh Refinery থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করা হয়।
২০১৭ সালে চালু হওয়া এই আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতের অবস্থান কী?
ভারতের এক প্রশাসনিক আধিকারিক জানিয়েছেন, বর্তমানে যে ডিজেল বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে তা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান জ্বালানি বাণিজ্য চুক্তিরই অংশ।
তবে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারতের নিজস্ব জ্বালানি পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থা বিবেচনা করা হবে।
অর্থাৎ ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরেই অতিরিক্ত সরবরাহ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি
বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যবহারের চাপ কমাতে একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত
- ঈদের ছুটি আগেভাগে ঘোষণা
- বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ
এই পদক্ষেপগুলির উদ্দেশ্য হল দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের চাপ কিছুটা কমানো।
সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ
জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
গত সপ্তাহে অনেক জায়গায় মানুষ দ্রুত জ্বালানি মজুত করার চেষ্টা করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার জ্বালানি বিক্রির উপর দৈনিক সীমাও আরোপ করেছে।
উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে উঠল বিষয়টি
ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল চাওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি আলোচনায় ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে।
এই বৈঠকটি হয়েছিল বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী এবং ঢাকায় নিযুক্ত High Commission of India in Bangladesh-এর প্রতিনিধিদের মধ্যে।
বৈঠকে বাংলাদেশ আগামী চার মাসের মধ্যে ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫০,০০০ টন ডিজেল পাওয়ার আবেদন জানিয়েছে বলে সূত্রের খবর।
বিদ্যমান জ্বালানি চুক্তি
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আগেই একটি জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে।
সেই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে Numaligarh Refinery থেকে মোট প্রায় ১,৮০,০০০ টন ডিজেল আমদানি করবে।
এই চুক্তির আওতায় বর্তমানে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে অবকাঠামো ও জ্বালানি বাণিজ্যের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে এই পাইপলাইন প্রকল্পও সেই উদ্যোগেরই একটি অংশ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ নিয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জ্বালানি কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



