Bangladesh India Relations : দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ফের নতুন ইঙ্গিত। আন্তর্জাতিক নৌ কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ আবহে ভারতে এসে ভিড়ল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বিএনএস সমুদ্র অভিযান। আন্তর্জাতিক নৌবহর পর্যালোচনা ও যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নিতেই ভারতের বিশাখাপত্তনম বন্দরে উপস্থিত হয়েছে এই জাহাজ। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফর শুধুমাত্র সামরিক সহযোগিতার অংশ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ।
বিশাখাপত্তনমে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক নৌবহর পর্যালোচনায় ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অংশ নিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৭০টি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন। এই নৌ সমাবেশ পর্যালোচনা করবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। রাষ্ট্রপতি দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত নজরদারি জাহাজ আইএনএস সুমেধা-তে করে নৌবহর পরিদর্শন করবেন। এই মহড়ায় বন্ধুরাষ্ট্রগুলিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও চিন ও তুরস্কের মতো দেশগুলিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি—যা আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের উপস্থিতি?
এই মহড়ায় বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশ–পাকিস্তান নৌবাহিনীর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল ভারতের কৌশলগত মহলে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস, তখন ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হয়েছিল বলে দাবি করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের যুদ্ধজাহাজ পিএনএস সইফ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছিল। ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম কোনও পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। ভারতের দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। সেই সময়ই জল্পনা শুরু হয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতে অশান্তি তৈরির চেষ্টা হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের নৌ মহড়ায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ঢাকা ফের দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছে।
দিল্লিকে আশ্বস্ত করল বিএনপি
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, “শেখ হাসিনা না থাকলেও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক কাঁটায় বিদ্ধ হবে না।” এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে দিল্লির কূটনৈতিক মহলের জন্য স্বস্তির।
দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ-কে ভারতপন্থী দল হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে বিএনপিকে ঘিরে কিছুটা সংশয় ছিল। তবে এবার ক্ষমতায় এসে সেই ধারণা ভাঙার চেষ্টাই করছে নতুন সরকার।
‘বেগম যুগ’-এর অবসান, ৩৪ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। ‘বেগম যুগ’-এর অবসান ঘটিয়ে ৩৪ বছর পর দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন একজন পুরুষ—তারেক রহমান। ক্ষমতায় এসেই ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তিনি। এই মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৬ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী।
তবে সমালোচনার জায়গাও রয়েছে। ৫০ জনের মন্ত্রিসভায় মাত্র তিন জন মহিলা স্থান পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন আফরোজা খানম রিতা। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ফারজানা শারমিন পুতুল এবং শামা ওবায়েদ। নারী প্রতিনিধিত্বের এই স্বল্পতা ইতিমধ্যেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও। তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন, যা নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
বদলের বাংলাদেশ, কোন পথে সম্পর্ক?
একদিকে ভারতের নৌ মহড়ায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, অন্যদিকে বিএনপির আশ্বাস—সব মিলিয়ে ইঙ্গিত স্পষ্ট। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালেও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক পুরোপুরি উল্টে যাচ্ছে না। বরং বাস্তববাদী কূটনীতির পথে হাঁটতে চাইছে নতুন ঢাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সমুদ্র সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। তবে নারী প্রতিনিধিত্ব, গণতান্ত্রিক চর্চা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলোই ঠিক করে দেবে ‘নতুন বাংলাদেশের’ আসল চরিত্র।



