Bangladeshi Umpire : ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্ক এই মুহূর্তে কার্যত তলানিতে। একের পর এক বিতর্ক, কূটনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা ইস্যু এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। ঠিক এই আবহেই নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল আম্পায়ারিং। প্রশ্ন উঠছে—ভারতে খেলোয়াড় পাঠাতে যদি নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে, তাহলে কীভাবে নির্বিঘ্নে ম্যাচ পরিচালনা করছেন বাংলাদেশের আম্পায়ার?
মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স মুস্তাফিজুরকে রিলিজ করে দেয়। বিসিবি সেই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। এমনকি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দল পাঠাতেও রাজি নয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
কিন্তু এই অবস্থানের মধ্যেই সামনে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। বরোদায় আয়োজিত ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে টিভি ও তৃতীয় আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের এলিট প্যানেলভুক্ত আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা সৈকত। কোনও রকম বাধা বা নিরাপত্তা সমস্যা ছাড়াই তিনি মাঠে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। আর এখানেই শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক।
নেটিজেনদের প্রশ্ন একটাই—যদি ভারতে নিরাপত্তা এতটাই অনিশ্চিত হয় যে বাংলাদেশ দলকে পাঠানো যাচ্ছে না, তাহলে একজন বাংলাদেশি আম্পায়ার কীভাবে নির্বিঘ্নে ভারতে কাজ করছেন? এই দ্বৈত নীতির অভিযোগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শরফুদ্দৌলা সৈকত নতুন কোনও নাম নন। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ভারতের টেস্ট সিরিজে একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। বিশেষ করে মেলবোর্নে বক্সিং ডে টেস্টে যশস্বী জয়সওয়ালকে আউট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন এই আম্পায়ার। স্নিকোমিটার ও আল্ট্রা এজে স্পষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও আউট দেওয়া হয়েছিল জয়সওয়ালকে।
সেই সময় এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন সুনীল গাভাসকর, রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও ইরফান পাঠানের মতো প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটাররা। তাঁদের মতে, ওই সিদ্ধান্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেই পুরনো ক্ষত এখনও অনেক ভারতীয় সমর্থকের মনে দাগ কেটে রয়েছে।
আর তাই একই আম্পায়ারকে ফের ভারতের ম্যাচে দায়িত্ব পালন করতে দেখে প্রশ্ন উঠছে—এই ক্ষেত্রে কি কোনও বয়কট বা আপত্তি তোলা হবে না? নেটিজেনদের একাংশের কটাক্ষ, “মুস্তাফিজুর খেলতে পারবেন না, কিন্তু আম্পায়ার ঠিকই টাকা কামাবেন?”
এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ভারতীয় সমাজমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। দীপু দাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে। এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছিল—বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতির প্রতিবাদ না করা কোনও ক্রিকেটারকে ভারতে খেলার অনুমতি দেওয়া উচিত কি না।
এই বিতর্কের মধ্যেই বিসিসিআই মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের আম্পায়ারকে নিরপেক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে ভারতীয় ম্যাচে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে—এতেই দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আম্পায়ার ও ক্রিকেটারের ভূমিকা আলাদা হলেও নিরাপত্তার যুক্তি যদি সত্যিই প্রাধান্য পায়, তাহলে তা সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। শুধুমাত্র খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে নিয়ম কঠোর আর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে শিথিল—এই নীতি স্বাভাবিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মুস্তাফিজুর বিতর্কের আবহে শরফুদ্দৌলা সৈকতের ভারতে উপস্থিতি ভারত–বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কের ফাটল আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের প্রশ্নে এই বিতর্ক কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার।



