২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বীরভূম জেলার সমস্ত হাইস্কুল ও মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রীদের চিহ্নিতকরণের জন্য বিশেষ রঙের কালি ব্যবহারের নির্দেশিকা ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়ে মঙ্গলবার বীরভূম জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (DI) অফিসে ডেপুটেশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করল পশ্চিমবঙ্গ সামাজিক ন্যায় মঞ্চ।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এই নির্দেশিকা কার্যকর হলে শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিক ও জাতিগত বিভাজন আরও গভীর হবে এবং তা সংবিধানের মৌলিক ভাবনার পরিপন্থী।
কী নির্দেশিকা জারি হয়েছে?
বিক্ষোভকারীদের দাবি অনুযায়ী, চলতি মাসের ১০ ডিসেম্বর বীরভূম জেলার জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (DI) দপ্তর থেকে জেলার সমস্ত হাইস্কুল ও মাদ্রাসায় একটি লিখিত নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে—
- ছাত্রছাত্রীদের এডমিশন রেজিস্টার
- এবং দৈনিক উপস্থিতি রেজিস্টারে
বিশেষ কিছু সামাজিক ও জাতিগত শ্রেণির ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা রঙের কালি ব্যবহার করতে হবে।
অর্থাৎ, কোন ছাত্র বা ছাত্রী কোন জাতি বা সামাজিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, তা নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে কালির রঙ আলাদা হবে।

কেন এই সিদ্ধান্ত?
DI অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই নির্দেশিকা জারি করার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ AI (Artificial Intelligence) ভিত্তিক সফটওয়্যার। ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমে—
- জাতিগত ভিত্তিতে কতজন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে
- কোন শ্রেণি বা জাতির উপস্থিতির হার কত
- কোন সামাজিক গোষ্ঠী স্কুলে কম বা বেশি প্রতিনিধিত্ব করছে
এই সব তথ্য দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশাসনের একাংশের দাবি, ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্প, বৃত্তি, মিড-ডে মিল বা অন্যান্য সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে এই ডেটা সহায়ক হবে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ
তবে পশ্চিমবঙ্গ সামাজিক ন্যায় মঞ্চ এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের এইভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক সামাজিক বার্তা বহন করে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি—
- এটি শিক্ষাক্ষেত্রে জাতিগত লেবেলিং বা ট্যাগিং তৈরি করবে
- ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মানসিক বিভাজন ও হীনমন্যতা বাড়বে
- সংবিধানের সমতা ও সামাজিক ন্যায় নীতির পরিপন্থী
এক বিক্ষোভকারী বলেন,
“স্কুল হল এমন একটি জায়গা যেখানে সবাই সমান। সেখানে রঙের কালি দিয়ে যদি ছাত্রদের আলাদা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে?”

DI অফিসে ডেপুটেশন
এই দাবিগুলি তুলে ধরতেই মঙ্গলবার বীরভূম জেলার DI অফিসে ডেপুটেশন দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাঁদের স্লোগানে উঠে আসে—
- “শিক্ষায় জাতিভেদ নয়”
- “রঙের কালি দিয়ে বিভাজন মানি না”
- “AI-এর নামে বৈষম্য চলবে না”
ডেপুটেশনের মাধ্যমে তারা অবিলম্বে এই নির্দেশিকা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
শিক্ষামহলে উদ্বেগ
এই নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষামহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ মনে করছেন—
- ছাত্রছাত্রীদের জাতিগত পরিচয় প্রকাশ্যে নথিভুক্ত করা সংবেদনশীল বিষয়
- এতে স্কুলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে
- ছাত্রদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নও উঠে আসছে
একজন শিক্ষক জানান,
“AI সফটওয়্যার ব্যবহার করা হতেই পারে, কিন্তু তার জন্য কালির রঙ বদলানোর মতো প্রকাশ্য পদ্ধতি কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটাই বড় প্রশ্ন।”
প্রশাসনের অবস্থান
যদিও এখনও পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের তরফে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি, তবে DI অফিস সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিষয়টি উচ্চস্তরে জানানো হয়েছে। সম্ভাবনা রয়েছে, রাজ্য শিক্ষা দপ্তর এই নির্দেশিকা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বড় প্রশ্ন সামনে
এই ঘটনার মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে—
- প্রযুক্তির সুবিধার জন্য কি সামাজিক বিভাজনের ঝুঁকি নেওয়া যায়?
- শিক্ষাক্ষেত্রে AI ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ ও মানবিক হওয়া উচিত?
- ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় সংরক্ষণে গোপনীয়তা ও সম্মান কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার দিকেই এখন তাকিয়ে শিক্ষামহল ও সাধারণ মানুষ।



