BNP Bangladesh : বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলে। সদ্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বিএনপি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করেই ঢেউ উঠেছে রাজনৈতিক বিতর্কের। একই সঙ্গে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে—ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কোন পথে এগোবে?
ক্ষমতায় আসতে চলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক আরও তিক্ত হবে, নাকি বাস্তববাদী কৌশলে এগোবে বাংলাদেশ—তা নিয়েই শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
“বাংলাদেশের স্বার্থই নির্ধারণ করবে বিদেশনীতি” — তারেক রহমান
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। নির্বাচনের পর প্রথম দিকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানান—
“বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থই আমাদের বিদেশনীতি নির্ধারণ করবে।”
এই বক্তব্যে একদিকে যেমন কূটনৈতিক ভারসাম্যের ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই স্পষ্ট যে কোনও দেশকেই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসতে চায় বিএনপি সরকার।
হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের জেরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে দৃশ্যমান শীতলতা তৈরি হয়। হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশের প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ ইউনুস।
এই সময় থেকেই বারবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে। বিএনপির অভিযোগ, হাসিনার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ রয়েছে, যার বিচার হওয়া প্রয়োজন।
নির্বাচনে জয়ের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাফ জানিয়ে দেন—হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন জানানো হবে।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে বাড়ছে উদ্বেগ
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ঘিরে ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক চাপ অনুভব করছে নয়াদিল্লি। কারণ হাসিনার শাসনকালেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে শুরু করে, যা ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—এই তিন দেশের সমীকরণ বরাবরই সংবেদনশীল।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার অভিযোগে দিল্লির প্রতিক্রিয়াও সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে।
তারেক রহমান কি ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন?
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে একাধিক ইঙ্গিত মিলছে যে, নতুন সরকার ভারতবিরোধী নয়, তবে “ভারতনির্ভর” নীতিও চাইছে না। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন—
“আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে মানুষের স্তরে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। তবে আমাদের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারই প্রথম।”
তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার একক কোনও দেশকে কেন্দ্র করে বিদেশনীতি পরিচালনা করতে চায় না।
নরেন্দ্র মোদি কোন কৌশল নেবেন?
এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি, অন্যদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে দিল্লির বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত হয়তো প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান না নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার পথেই এগোবে।
নতুন অধ্যায়ের সূচনালগ্নে বাংলাদেশ
একসময় শেখ হাসিনার আমলে কারাবন্দি হয়েছিলেন বিএনপি নেত্রী ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আজ তাঁরই পুত্র তারেক রহমান বাংলাদেশের শাসনভার নিতে চলেছেন। ফলে এই ক্ষমতার পালাবদল শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রতীকী দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তারেক রহমানের কড়া বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে। এখন দেখার, এই সমীকরণ দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা বাড়াবে, নাকি উত্তেজনা আরও গভীর করবে।



