কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের আগে থেকেই প্রত্যাশা ছিল—সামনেই চার রাজ্যের বিধানসভা ভোট, ফলে ভোটমুখী রাজ্যগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। সেই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গও থাকবে, এমনটাই আশা করেছিলেন রাজ্যের মানুষ ও রাজনৈতিক মহল। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর স্পষ্ট হয়ে গেল—বাংলার জন্য বড় কোনও প্রাপ্তি নেই এবারের বাজেটে। আবারও কি বঞ্চনার অভিযোগে মুখর হতে চলেছে রাজ্য?
নির্মলা সীতারামনের বাজেট বক্তৃতায় পশ্চিমবঙ্গের নাম একাধিকবার উঠে এলেও, তা মূলত সীমিত কয়েকটি পরিকাঠামোগত ঘোষণার মধ্যেই আটকে রইল। কোনও বড় শিল্প প্রকল্প, কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বা কর্মসংস্থানমুখী বিশেষ প্যাকেজ—কিছুই নেই বাংলার ঝুলিতে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিজেপি কি আদৌ বাংলাকে সমান গুরুত্ব দিতে চাইছে, নাকি রাজনৈতিক সমীকরণই সবকিছু নির্ধারণ করছে?
বাজেটে বাংলার জন্য কী ঘোষণা হল?
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্গাপুরকে কেন্দ্র করে একটি ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি পাঁচটি শহরে ট্যুরিজম হাব তৈরি হবে, যার মধ্যে একটি পাবে পশ্চিমবঙ্গ। বাকিগুলি যাবে বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশে। এছাড়া গুজরাতের সুরাট থেকে পশ্চিমবঙ্গের ডানকুনি পর্যন্ত একটি নতুন ফ্রেট করিডর তৈরির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে দেশের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ আরও মজবুত হবে।
রেল পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে আরও একটি ঘোষণা হল—‘সমৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় সাতটি হাই-স্পিড রেল করিডর তৈরি হবে। তার মধ্যে একটি বরাদ্দ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। এছাড়া বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত একটি রেল করিডর তৈরির কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এখানেই শেষ। এই ঘোষণাগুলি ছাড়া নতুন করে কোনও বড় প্রকল্প বা আর্থিক প্যাকেজের কথা শোনা যায়নি।
তুলনায় কারা পেল বেশি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেট স্পষ্টভাবে শরিক রাজ্যগুলিকে তুষ্ট রাখার কৌশল নিয়েছে কেন্দ্র। বিহার এবং অন্ধ্রপ্রদেশ—এই দুই রাজ্যই বর্তমানে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সংসদীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রতিফলন দেখা গেল বাজেটে।
বিহারের জন্য গত বাজেটেই ঘোষণা হয়েছিল মাখানা বোর্ড, গ্রিনফিল্ড বন্দর, পটনা বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফুড টেকনোলজি। এবারও সেই রাজ্য কেন্দ্রের বিশেষ নজরে রয়েছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের।
অন্যদিকে টিডিপি শাসিত অন্ধ্রপ্রদেশ পেল আরও বড় প্রাপ্তি। সেখানে তৈরি হচ্ছে একটি ডেডিকেটেড রেয়ার আর্থ করিডর, দু’টি হাই-স্পিড রেল করিডর এবং বিশাখাপত্তনমে গুগলের একটি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার। এই প্রকল্পের জন্য কেন্দ্র ২০৪৭ সাল পর্যন্ত ট্যাক্স হলিডে ঘোষণা করেছে, যা কার্যত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রণোদনা।
বাংলার ক্ষেত্রে কেন এই অনীহা?
এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। বিজেপি প্রকাশ্যে দাবি করে, তারা বাংলায় ক্ষমতায় আসতে চায়। কিন্তু বাজেটের দিকে তাকালে সেই আগ্রহের প্রতিফলন কোথায়? বিরোধীদের অভিযোগ, যে রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কম, সেই রাজ্যকে কেন্দ্র বরাবরই বঞ্চিত করে।
এমনকি কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরও দাবি করেছেন, নির্মলার বাজেটে কেরলের জন্য তেমন কিছুই নেই। তামিলনাড়ুও এই বাজেটে অসন্তুষ্ট। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু বাংলা নয়—যেসব রাজ্য কেন্দ্রের রাজনৈতিক অঙ্কে জরুরি নয়, তারাই নাকি উপেক্ষিত।
উন্নয়ন নাকি রাজনৈতিক অঙ্ক?
এই বাজেট ফের প্রশ্ন তুলে দিল—উন্নয়ন কি সত্যিই সবার জন্য? নাকি কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজনের নিরিখে কিছু রাজ্যকে বেছে নেওয়া হচ্ছে? বাংলার প্রাপ্তি সীমিত, চমকহীন এবং প্রত্যাশার অনেক নিচে। শিল্প, কর্মসংস্থান, শিক্ষা—কোনও ক্ষেত্রেই বিশেষ বরাদ্দ নেই।
বিরোধীদের কটাক্ষ, “বাংলায় ক্ষমতায় না আসতে পারলে নরেন্দ্র মোদী নাকি তৃপ্তির স্বাদই পান না।” বিজেপির অবশ্য পাল্টা যুক্তি, পরিকাঠামো উন্নয়নেই ভবিষ্যতের লাভ। কিন্তু রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে সেই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে এবারের কেন্দ্রীয় বাজেট পশ্চিমবঙ্গের জন্য নিরাশাজনক। কিছু পরিকাঠামোগত ঘোষণার বাইরে বড় কোনও চমক নেই। আর সেই ফাঁকটাই আরও একবার বুঝিয়ে দিল—দিল্লির ক্ষমতার অঙ্কে বাংলা এখনও মূল ফোকাসের বাইরে। এই পরিস্থিতিতে বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যে আরও তীব্র হবে, তা বলাই বাহুল্য।



