শীত মানেই উৎসব। বড়দিন, ইংরেজি নববর্ষ—এই সময়ে কেক ছাড়া উৎসব যেন অসম্পূর্ণ। পরিবারের সঙ্গে, বন্ধুদের আড্ডায় নানা রঙের, নানা স্বাদের কেক কেটে আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই শীতের মরসুমের অন্যতম আকর্ষণ। অথচ এই আনন্দের মরসুমেই শুনশান চন্দ্রকোনার একসময়ের নামী বেকারি কারখানা। কর্মীর অভাবে প্রায় বন্ধের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় চার দশকের পুরনো একটি বেকারি।
ঘাটাল মহকুমার চন্দ্রকোনা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের খিড়কিবাজার এলাকায় ১৯৮৮ সালে গড়ে উঠেছিল এই বেকারি কারখানা—‘ওরিয়েন্ট বেকারি’। কারখানার মূল ফটকে আজও ঝকঝক করছে নামের ফলক। কিন্তু ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে তাল হারিয়ে ফেলেছে একসময়ের ব্যস্ত এই কারখানা।
একসময়ের ব্যস্ত কারখানা, আজ নিস্তব্ধ
কয়েক বছর আগেও এই বেকারি কারখানায় ছিল কর্মচাঞ্চল্য। সকাল থেকে রাত—দিনরাত তিন শিফটে চলত কাজ। কেক, রুটি, বিস্কুট, পেস্ট্রি—বিভিন্ন সাইজ ও স্বাদের পণ্য তৈরি হতো এখানে। খুচরো ও পাইকারি ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত কাউন্টারে। হোকাররা এখান থেকে পণ্য নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতেন।
সে সময় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন কর্মী কাজ করতেন কারখানায়। কর্মীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও ছিল কারখানার মধ্যেই। মালিক পক্ষের দাবি, কর্মীদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরেও কারখানা থেকে যে আয় হতো, তা দিয়েই সংসার ও ব্যবসা নির্বিঘ্নে চলত।

করোনা বদলে দিল সবকিছু
কিন্তু সেই চিত্র বদলে যায় করোনা অতিমারির সময়। লকডাউনের জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ভিন জেলা থেকে আসা অধিকাংশ কর্মী নিজেদের বাড়িতে ফিরে যান। পরবর্তীকালে কয়েকজন ফিরলেও কর্মীর সংখ্যা আর আগের মতো হয়নি। ফলে উৎপাদন কমতে শুরু করে।
ওরিয়েন্ট বেকারির মালিক, ৬০ বছর বয়সী এনামুল হক জানালেন, “করোনার সময় কর্মীরা যে যার জেলায় ফিরে যায়। পরে আর সবাইকে ফেরানো যায়নি। কর্মীর অভাবে ধীরে ধীরে কাজ কমে আসে।”
ব্যক্তিগত বিপর্যয়ও প্রভাব ফেলেছে
করোনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত আর্থিক বিপর্যয়ও এই বেকারির উপর প্রভাব ফেলেছে। এনামুল হক জানান, “আমার একটি যাত্রীবাহী বাস ছিল। সেটা দুর্ঘটনায় পড়ে যায়। অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। পরে বাসটাও ধরে রাখা যায়নি। তারপর করোনা এসে সব এলোমেলো করে দিল।”
তিনি আরও জানান, তার নিজের কোনও জমি বা সম্পত্তি নেই। এই বেকারি কারখানাই তার সংসারের একমাত্র ভরসা।
এখন একাই সামলাচ্ছেন কারখানা
বর্তমানে এনামুল হক প্রায় একাই কারখানার কাজ সামলাচ্ছেন। আগের মতো সব ধরনের পণ্য তৈরি করা তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এখন তিনি মূলত আটা-ময়দা দিয়ে অনুসন্ধান, ভুট্টা দিয়ে রঙিন ও সাদা পাঁপড়, উচ্ছে, করলা, ললি তৈরি করছেন।
তার দুই ছেলে—এমএ পাশ আইনুল হক খান এবং মাধ্যমিক পাশ কাশেমউল হক খান বাবার কাজে সাহায্য করছেন। কারখানায় তৈরি পণ্য কিছু পুরনো পরিচিত দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাই নিয়ে যান।

সংসার কোনওমতে চলছে
এনামুল হকের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী নুরবাহার বিবি, ছয় ছেলে ও এক মেয়ে। চার ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা আলাদা সংসার করছেন। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই অবিবাহিত ছেলেকে নিয়ে কোনওমতে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, “লাভ-ক্ষতির হিসাব রাখি না। যা আসে, তাতেই কোনওরকমে সংসার চলে যায়।”
স্থানীয়দের আক্ষেপ
স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মইদুল রহমান বলেন, “একসময় বড়দিন আর পয়লা জানুয়ারিতে এই বেকারি থেকে টাটকা কেক কিনতে মানুষের ভিড় লেগে থাকত। নানা স্বাদের কেক পাওয়া যেত। ডিসেম্বর মাসে দিনরাত কাজ চলত। এখন আর সেই দৃশ্য নেই।”
উৎসবের মরসুমেও অনিশ্চয়তা
আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ। যখন চারদিকে কেকের চাহিদা বাড়ছে, তখন কর্মীর অভাবে ধুঁকছে চন্দ্রকোনার এই ঐতিহ্যবাহী বেকারি। একসময় যে বেকারি শীতের উৎসবের আনন্দে রসদ জুগিয়েছে, আজ সে নিজেই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে।



