India China Relations : ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসে আচমকাই কূটনৈতিক সৌজন্যের বার্তা পাঠাল চিন। বেজিংয়ের তরফে ভারতকে ‘ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করে যে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানো হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গালওয়ান উপত্যকা থেকে অরুণাচল প্রদেশ— সীমান্তে একের পর এক সংঘর্ষ ও উত্তেজনার ইতিহাসের প্রেক্ষিতে চিনের এই বন্ধুত্বের দাবি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ভারত ও চিনের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়া প্রয়োজন এবং পারস্পরিক উদ্বেগ আলোচনার মাধ্যমে মেটানো সম্ভব। কূটনৈতিক ভাষায় এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক শোনালেও, বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ এই সৌজন্যকে খুব একটা সরলভাবে দেখতে নারাজ।
কারণ ইতিহাস বলছে, চিনের বন্ধুত্বের ভাষার আড়ালে বহুবার লুকিয়ে থেকেছে কৌশলগত চাল। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষে ভারতীয় সেনার প্রাণহানি, তার পর লাদাখে দীর্ঘ সেনা মোতায়েন, অরুণাচল প্রদেশকে বারবার নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি— এই সব ঘটনা এখনও ভারতের কৌশলগত স্মৃতিতে টাটকা। ফলে হঠাৎ করে ‘ভালো বন্ধু’ আখ্যা দেওয়াকে অনেকেই নতুন কোনও কূটনৈতিক পরিকল্পনার অংশ বলেই মনে করছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির পটভূমিতে চিনের এই অবস্থান বদলের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। একদিকে, আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক চাপে রয়েছে। অন্যদিকে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কোয়াড জোট, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে দিল্লির ভূমিকা এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। এই বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা হলেও স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে বেজিং— এমনটাই মত কূটনৈতিক মহলের একাংশের।
তবে দিল্লি যে এই বার্তায় পুরোপুরি আশ্বস্ত, তা নয়। গালওয়ান সংঘর্ষের পর একাধিক সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরের আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, প্রকৃত সমাধান এখনও হয়নি। চিনের সেনা উপস্থিতি এবং অবকাঠামো নির্মাণ ভারতের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই বন্ধুত্বের বার্তা এলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বদলায়নি বলেই মনে করছে ভারতের নীতিনির্ধারক মহল।
এই প্রেক্ষাপটে চিনের বার্তাকে অনেকেই ‘ফ্রেন্ডলি ডিপ্লোম্যাসি’ বা মুখে মধু, অন্তরে ছল— এই পরিচিত কৌশলের সঙ্গে তুলনা করছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়, যেখানে চিন প্রকাশ্যে বন্ধুত্বের কথা বললেও, নেপথ্যে নিজেদের স্বার্থে কৌশল সাজিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, একই দিনে ভারতকে প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছে আমেরিকাও। মার্কিন স্বরাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও এক বার্তায় ভারত-মার্কিন সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বলেন, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতায় দুই দেশের অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এই বার্তা স্পষ্ট করে দেয়, বিশ্ব রাজনীতির দুই শক্তিশালী মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারতকে এখন সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
একদিকে চিনের সৌজন্যপূর্ণ বার্তা, অন্যদিকে আমেরিকার কৌশলগত বন্ধুত্ব— এই দুইয়ের মধ্যে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি চাইছে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, কিন্তু নিজের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আপস নয়। ফলে চিনের বার্তাকে স্বাগত জানালেও, বাস্তব পদক্ষেপ না দেখা পর্যন্ত সাবধানী অবস্থানেই থাকবে ভারত— এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রজাতন্ত্র দিবসে চিনের ‘বন্ধুত্বের ডাক’ নিছক সৌজন্য নাকি বৃহত্তর কূটনৈতিক খেলের অংশ— তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে গালওয়ান ও অরুণাচলের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ভারত যে আর সহজে বিশ্বাস করবে না, তা স্পষ্ট। দিল্লির কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— শক্ত অবস্থান বজায় রেখে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা।



