ভারত ও চিন—দুটি প্রাচীন সভ্যতা, অথচ আধুনিক রাজনীতিতে সম্পর্ক বরাবরই টানাপোড়েনের। সীমান্ত সংঘর্ষ, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরেই জটিল করে রেখেছে। এমন আবহেই ফের ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বেইজিংয়ের এক গোপন প্রকল্প—হিমালয় পর্বতমালায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও বিপজ্জনক জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই প্রকল্প শুধু পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে না, বরং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও জল-স্বার্থের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সীমান্তে বরফ গললেও বিশ্বাস কি ফিরেছে?
২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারত ও চিনের মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়। পূর্ব লাদাখের ডেমচোক ও ড্যাপসাং সমতলে টহলদারি পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর কার্যত বন্ধ ছিল। এই চুক্তির পর আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা ছিল—দুই দেশের সম্পর্কে হয়তো নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
২০২৫ সালে সেই আশাকে আরও জোরালো করেছিল সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মুখোমুখি সাক্ষাৎ। মনে করা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের সামরিক অচলাবস্থা কাটিয়ে কূটনৈতিক স্তরে বরফ গলবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে পুরনো কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বার্তা দিলেও চিন কার্যত নিজের কৌশল বদলায়নি। বরং পরোক্ষভাবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতকে কৌশলগত চাপে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং—এমন অভিযোগ নতুন নয়।
পাকিস্তান বা বাংলাদেশ—দুটি দেশই সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারতের সমকক্ষ নয়। তবুও সীমান্ত উত্তেজনা বা কূটনৈতিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে তারা যে আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছে, তার পেছনে চিনা সমর্থন রয়েছে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

ব্রহ্মপুত্রে ‘দানবীয়’ বাঁধ: আসল উদ্বেগের জায়গা
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীতে (ভারতে যা ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত) চিনের প্রস্তাবিত এক বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রায় ১৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হতে চলা এই বাঁধকে বেইজিং দাবি করছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে।
চিনা সূত্র অনুযায়ী, এই প্রকল্পটি থ্রি গর্জেস ড্যামের তুলনায় তিন গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে। কিন্তু প্রকল্পের নকশা, কাঠামো বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করেনি চিন। প্রকল্পটির অস্থায়ী নাম ‘ওয়াইএক্স প্রজেক্ট’, যার গোপনীয়তা নিয়েই বাড়ছে উদ্বেগ।
ভূমিকম্পপ্রবণ হিমালয়ে বাঁধ—কতটা নিরাপদ?
হিমালয় অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এমন অঞ্চলে এত বড় জলাধার নির্মাণ মানে বিপর্যয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ানো। যদি কোনো বড় ভূমিকম্প বা কাঠামোগত বিপর্যয় ঘটে, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—
- চিন ইচ্ছাকৃতভাবে নদীর জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টি করতে পারে
- শুষ্ক মৌসুমে জল আটকে রেখে ভারতের জল সংকট বাড়াতে পারে
- অসম, অরুণাচল প্রদেশ সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশও বিপদের মুখে
ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উপর নির্ভর করে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নদী-নির্ভর বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কূটনৈতিক ভাষায় সৌজন্য বজায় থাকলেও, বাস্তবে চিনের পদক্ষেপ ভারতের জন্য ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সীমান্ত, জলনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে বেইজিংয়ের এই আগ্রাসী কৌশল ভারতের সামনে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—
বন্ধুত্বের আশ্বাসের আড়ালে কি আরও বড় বিপদের প্রস্তুতি নিচ্ছে ড্রাগন?



