Debolina Nandi : আজ আবারও প্রমাণ হয়ে গেল—সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যা দেখি, সবটাই বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়। ঝকঝকে হাসি, মধুর কণ্ঠ, সুন্দর মুহূর্তের ভিডিও—সব কিছুর আড়ালেও যে একজন মানুষ নিঃশব্দে ভেঙে পড়তে পারেন, সংগীতশিল্পী দেবলীনা নন্দীর সাম্প্রতিক ঘটনা সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
যে মেয়েটাকে দেখে মনে হতো, জীবনটা যেন একেবারে গোছানো, সুখে-শান্তিতে ভরা—আসলে সেই দেবলীনা ভিতরে ভিতরে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
🎶 গান, হাসি আর সোশ্যাল মিডিয়ার সাজানো জীবন
দেবলীনা নন্দী শুধু একজন গায়িকা নন, বহু মানুষের কাছে তিনি একরাশ ভালো লাগার ঠিকানা। একটুখানি মন খারাপ হলেই তাঁর গান শুনে মন ভালো হয়ে যেত অনেকের। গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের জীবনের ছোট ছোট সুন্দর মুহূর্ত তুলে ধরতেন—পরিবার, বাবা-মা, শ্বশুরবাড়ির মানুষজন, দৈনন্দিন হাসি-খুশির গল্প।
এসব দেখে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের ধারণা ছিল, তিনি খুব সুন্দরভাবে নিজের সংসার ও কেরিয়ার সামলে নিচ্ছেন। গত বছরই পাইলট প্রবাহ নন্দীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন দেবলীনা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের জুটিকে দেখে বহু মানুষ বলতেন—“একেবারে পারফেক্ট কাপল”।
কিন্তু বাস্তবটা যে এতটা আলাদা, তা কেউ ভাবতেও পারেননি।
📱 একটি লাইভ, যা সব মুখোশ খুলে দিল
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় আচমকাই দেবলীনার একটি লাইভ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান—তিনি ভালো নেই। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের টানাপোড়েনে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
লাইভে দেবলীনা বলেন, বিয়ের পর থেকেই তাঁর মাকে নিয়ে নানান সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে, সকলের মন জয়ের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দিনের পর দিন মানিয়ে নিতে গিয়ে তিনি নিজেই যেন হারিয়ে যাচ্ছিলেন।
শ্বশুরবাড়ির কারও নাম উল্লেখ না করেই তিনি বলেন, সংসার করতে গিয়ে তাঁকে বারবার বলা হয়েছে—“মাকে ছেড়ে দিতে হবে।” এই কথাটা তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কাজ নিয়েও বাড়িতে তৈরি হচ্ছিল চাপ ও অসন্তোষ।
💔 “আমি অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু আর পারলাম না”
লাইভ চলাকালীন দেবলীনার কথাগুলো শুনে যে কোনও সংবেদনশীল মানুষেরই বুক কেঁপে উঠবে। তিনি বলেন—
“আমি অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু আর পারলাম না। এই লাইভটা যখন সবাই দেখবে, তখন হয়তো আমি থাকব না। আমাকে নিয়ে হয়তো নিউজ হবে। তবে আমি চেয়েছিলাম জীবনের শেষ সময়ে আমি সেজেগুজে থাকি, তাই আজ সুন্দর করে সেজেছি।”
এই কথাগুলো থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি কতটা মানসিক অবসাদের মধ্যে ছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ার দর্শকদের বুঝতে দেরি হয়নি—দেবলীনা চরম মানসিক সংকটে রয়েছেন।
🏥 হাসপাতালে ভর্তি, বিপদমুক্ত দেবলীনা
লাইভ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খবর আসে—দেবলীনা হাসপাতালে ভর্তি। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, তিনি নিজের জীবনের প্রতি চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
দেবলীনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সায়কের শেয়ার করা একটি ছবিতে দেখা যায়, হাসপাতালের বেডে শুয়ে রয়েছেন গায়িকা। সেই পোস্ট থেকেই জানা যায়—বর্তমানে তিনি বিপদমুক্ত এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
এই খবর কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে তাঁর ভক্তদের মনে। তবে একইসঙ্গে এই ঘটনা ভেঙে দিয়েছে বহু মানুষকে।
🧠 এই ঘটনা আমাদের কী শেখায়?
দেবলীনা নন্দীর ঘটনা আবারও আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরল—
👉 সব হাসির আড়ালে সুখ থাকে না
👉 মানিয়ে নেওয়া মানেই সবসময় শক্ত থাকা নয়
👉 সম্পর্ক বাঁচাতে গেলে শুধু একজনের নয়, সবার চেষ্টা দরকার
একজন মানুষ দিনের পর দিন কতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গেলে এমন সিদ্ধান্তের কথা ভাবতে পারেন, তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।
🤍 যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন
এই ধরনের মুহূর্তে একাকী থাকার দরকার নেই। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়।
📞 ভারতে মানসিক সহায়তা হেল্পলাইন:
- কিরণ (Mental Health Helpline): 1800-599-0019
- Sneha Foundation: 044-24640050
একটি ফোন কল, একটি কথা—কারও জীবন বাঁচাতে পারে।
🔎 উপসংহার
দেবলীনা নন্দীর ঘটনা আমাদের সমাজকে একটি আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানসিক যন্ত্রণা বোঝার সময় এসেছে। কাউকে দেখে “সব ঠিক আছে” ধরে নেওয়ার আগে একটু থামা, একটু শোনা, একটু বোঝা—এগুলোই হয়তো অনেক জীবন বাঁচাতে পারে।
আমরা আশা করি, দেবলীনা দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার তাঁর গানে, তাঁর হাসিতে ফিরে আসবেন।



