২৩ ডিসেম্বর থেকে গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে শুরু হয়েছে আশাকর্মীদের কর্মবিরতি। সেই আন্দোলনেরই অংশ হিসেবে বুধবার ২৪ ডিসেম্বর দুপুরে ধুলিয়ান পৌরসভার সামনে অবস্থান-বিক্ষোভে সামিল হলেন ধুলিয়ান পৌর এলাকার আশাকর্মীরা। পশ্চিমবঙ্গ পুর স্বাস্থ্যকর্মী কন্ট্রাকচুয়াল ইউনিয়নের মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির উদ্যোগে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়। সকাল থেকেই পৌরসভার সামনে জড়ো হয়ে কর্মবিরতি পালন করতে থাকেন শতাধিক আশাকর্মী।
এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন ধুলিয়ান পৌর এলাকার আশাকর্মী শিবানী সিংহ, মহামুদা খাতুন, সাবিনা ইয়াসমিন, চন্দ্রা ঘোষ সহ আরও বহু স্বাস্থ্যকর্মী। একই দিনে আশাকর্মীদের পাশাপাশি ধুলিয়ান পৌরসভার অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীরাও তাঁদের নিজ নিজ দাবি নিয়ে কাজ বন্ধ রেখে আন্দোলনে শামিল হন। ফলে এদিন পৌর এলাকার স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যত ব্যাহত হয়।
রাজ্যজুড়ে কর্মবিরতির প্রভাব ধুলিয়ানেও
আশাকর্মীরা জানান, রাজ্য সরকারের একাধিক দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের দাবি-দাওয়া জানানো হলেও কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারই প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছে। ধুলিয়ানেও সেই কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে পূর্ণ মাত্রায়।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, আশাকর্মীরা মূলত মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত। গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিশুদের টিকাকরণ, পুষ্টি সংক্রান্ত পরামর্শ, স্বাস্থ্য সমীক্ষা—এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কাজ করতে হয় তাঁদের। কিন্তু এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পরেও তাঁরা সরকারি কর্মীর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত।
বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজের অভিযোগ
বিক্ষোভরত আশাকর্মীদের অভিযোগ, নির্ধারিত কাজের বাইরেও তাঁদের দিয়ে প্রায়শই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করানো হয়। কখনও ভোটের কাজ, কখনও স্বাস্থ্য সমীক্ষা, কখনও আবার বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ডাকা হয়। অথচ সেই কাজের জন্য আলাদা কোনও পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।
একজন আশাকর্মী বলেন, “দিনের পর দিন কাজ করেও আমরা স্থায়ী চাকরির স্বীকৃতি পাই না। কোনও ছুটি নেই, কোনও নিরাপত্তা নেই। অসুস্থ হলেও কাজ করতে হয়।”
বর্তমানে মাসে সামান্য পাঁচ হাজার টাকার কিছু বেশি পারিশ্রমিকেই সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। এই অল্প আয়ে পরিবার চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানান আন্দোলনকারীরা।
আশাকর্মীদের মূল দাবিগুলি কী
বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁদের দাবিগুলি অত্যন্ত যৌক্তিক ও ন্যায্য। সেগুলির মধ্যে রয়েছে—
- আশাকর্মীদের সরকারি কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি
- ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন
- মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা
- কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ
- বকেয়া উৎসাহ ভাতা অবিলম্বে মেটানো
- সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশনের ব্যবস্থা
তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হয়ে কাজ করলেও আজও তাঁরা চরম অবহেলার শিকার।
স্মারকলিপি দিয়েও মেলেনি সমাধান
আশাকর্মীরা জানান, এর আগেও একাধিকবার প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে রাজ্য স্তর পর্যন্ত বিভিন্ন দপ্তরে দাবি জানানো হলেও কোনও স্থায়ী সমাধান সূত্র মেলেনি। ফলে বাধ্য হয়েই তাঁরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির পথে হেঁটেছেন।
এক আন্দোলনকারী বলেন, “আমাদের দাবি না মানা হলে এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর আকার নেবে। আমরা চাই সরকার আমাদের কথা শুনুক।”
স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
এই কর্মবিরতির ফলে ধুলিয়ান পৌর এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের নিয়মিত পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, দাবি পূরণ না হলে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী থাকবে প্রশাসন।
এদিকে, এখনও পর্যন্ত ধুলিয়ান পৌরসভা বা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আন্দোলন নিয়ে কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আগামী দিনে আন্দোলন আরও তীব্র হতে পারে
আশাকর্মীদের স্পষ্ট বক্তব্য, যতদিন না তাঁদের দাবি মানা হচ্ছে, ততদিন কর্মবিরতি চলবে। প্রয়োজনে রাজ্যস্তরে বৃহত্তর আন্দোলনের পথেও হাঁটার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে ধুলিয়ান পৌরসভার সামনে আশাকর্মীদের এই কর্মবিরতি এখন জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।



