বছরের শেষ মানেই বাঙালির কাছে উৎসব, ভ্রমণ আর সমুদ্রের টানে ছুটে যাওয়া। আর সেই তালিকার শীর্ষেই রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্রনগরী দীঘা। বড়দিন ও বর্ষবরণ—এই দু’টি উপলক্ষকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই উৎসবের আমেজে ঢুকে পড়েছে সাগরপাড়। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ২৫ ডিসেম্বর থেকেই দীঘা শহর জুড়ে শুরু হবে আলোর রোশনাই, যা চলবে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো পর্যন্ত।
এবারের বর্ষশেষে দীঘায় পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় অনেকটাই বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের। সেই কারণেই আগে থেকেই সতর্ক হয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ।
প্রশাসনিক বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
এই ভিড় সামাল দিতে সম্প্রতি দীঘা উন্নয়ন পর্ষদের কার্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলাশাসক, ভারপ্রাপ্ত জেলা পুলিশ আধিকারিক, দীঘা উন্নয়ন পর্ষদের আধিকারিকরা, হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার সদস্যরা।
বৈঠক শেষে জেলাশাসক জানান, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং ব্যবস্থা ও সমুদ্রসৈকত এলাকায় নজরদারি—এই তিনটি বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদের যাতে কোনও রকম অসুবিধার মুখে পড়তে না হয়, তার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আলোর সাজে নতুন রূপ দীঘার
২৫ ডিসেম্বর থেকে গোটা দীঘা শহর কার্যত উৎসবের আলোয় সেজে উঠবে।
- একদিকে, হোটেল ও রিসর্ট মালিকরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তুলবেন।
- অন্যদিকে, দীঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের (DSDA) উদ্যোগে জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন রাস্তা, ওল্ড দীঘা ও নিউ দীঘার বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত সাজানো হবে ঝলমলে আলোয়।
এই আলোর সাজ পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছে প্রশাসন।
হোটেলের ভাড়া বাড়ানো নিয়ে কড়া নজর
প্রতিবছরই বড়দিন ও বর্ষবরণের সময় দীঘায় হোটেলের ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। অনেক পর্যটকই একে ‘ফেস্টিভ সিজনের কালোবাজারি’ বলে অভিহিত করেন। এবার সেই প্রবণতা বন্ধ করতে প্রশাসন কড়া অবস্থান নিয়েছে।
জেলাশাসক স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য কেউ যদি অনৈতিকভাবে ভাড়া বাড়ায়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে—এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নজরদারি চালানো হবে। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
নিরাপত্তায় জোর, বাড়তি পুলিশ মোতায়েন
ভারপ্রাপ্ত জেলা পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, বর্ষশেষের ভিড় মাথায় রেখে দীঘায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
- সমুদ্রসৈকত এলাকায় থাকবে বিশেষ নজরদারি
- সিসিটিভি মনিটরিং বাড়ানো হবে
- রাতে টহল আরও জোরদার করা হবে
লক্ষ্য একটাই—যেন কোনও পর্যটক নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় না পড়েন এবং নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।

বিচ সাইড ফেস্টিভ্যাল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
এ বছরও দীঘায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে জনপ্রিয় বিচ সাইড ফেস্টিভ্যাল। হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সমুদ্রের ধারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। গান, নাচ ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করা হবে।
অলিম্পিকের আদলে আতশবাজির অপেক্ষা
দীঘা-শঙ্করপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুশান্ত পাত্র জানান, বর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও বিশাল আতশবাজির প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা রয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, এই আতশবাজি হবে অলিম্পিকের ধাঁচে, যা সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারবেন পর্যটকরা।
তবে এখনও পর্যন্ত পরিবেশ দপ্তরের চূড়ান্ত ছাড়পত্র মেলেনি। অনুমতি পেলেই এই আতশবাজির আয়োজন বাস্তবায়িত হবে বলে জানানো হয়েছে।
পর্যটকদের জন্য বার্তা
সব মিলিয়ে প্রশাসন, পুলিশ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সমন্বয়ে দীঘা প্রস্তুত বড়দিন ও বর্ষবরণ উদযাপনের জন্য। এখন শুধু অপেক্ষা—পরিবেশ দপ্তরের সবুজ সংকেত মিললে, সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা সেই বহুচর্চিত আতশবাজির ঝলক দেখতে পারবেন কি না।



