ED Raid : প্রতীক জৈনের বাড়ি ও আইপ্যাকের অফিসে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের তল্লাশি ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ও রাজ্য প্রশাসনের সংঘাত এবার পৌঁছে গিয়েছে হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায়। প্রশ্ন উঠছে—রাজ্য পুলিশ কি আদৌ ইডির আধিকারিকদের গ্রেপ্তার করতে পারে? কেন্দ্রীয় সংস্থাকে কি সত্যিই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল? আর এই পরিস্থিতিতে আগাম আইনি চাল চাললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ইডিকে হুমকি? কী বলা হয়েছে প্রতিবেদনে
‘ইন্ডিয়া টুডে’-র একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চলাকালীন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের সূত্র উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তল্লাশির সময় ডিজি নাকি ইডি আধিকারিকদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন—পঞ্চনামায় যেন কোনও জিনিস বাজেয়াপ্ত করার উল্লেখ না থাকে।
আরও দাবি করা হয়, কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকদের বলা হয়েছিল, তল্লাশিতে যেন দেখানো হয় কিছুই পাওয়া যায়নি। সেই নির্দেশ না মানলে ইডি অফিসারদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে—এমন হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল বলে সূত্রের দাবি।
যদিও এই অভিযোগ নিয়ে এখনও পর্যন্ত রাজ্য পুলিশ বা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।
ইডির পালটা অভিযোগ: নথি ও ডিজিটাল ডিভাইস ছিনতাই
এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের পক্ষ থেকে আদালতে দাবি করা হয়েছে, তল্লাশি চলার মধ্যেই বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে ঢুকে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইডির অভিযোগ অনুযায়ী, জোর করে কেন্দ্রীয় সংস্থার হেফাজতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে যাওয়া হয়।
ইডি আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছে—
- যেসব নথি ও ডিভাইস নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেগুলি অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়া হোক
- যতক্ষণ না সেগুলি ইডির হাতে আসছে, ততক্ষণ কোনও তথ্য বিকৃতি যেন না হয়
- গোটা ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই বিষয়টি হাই কোর্টে গড়ায়।
মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি ঘিরে বিতর্ক
বৃহস্পতিবার সকালে প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডির তল্লাশির সময় মুখ্যমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী খালি হাতে বাড়িতে ঢুকে পরে সবুজ ফাইল হাতে বেরিয়ে আসেন। পরে তিনি দাবি করেন, ওই ফাইল ও নথিগুলি তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কৌশল সংক্রান্ত কাগজপত্র।
পরবর্তীতে সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিস থেকেও একাধিক নথি গাড়িতে তোলা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, অফিসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা তৃণমূলের কাগজপত্রই তিনি সুরক্ষিত করার জন্য নিয়ে গিয়েছেন।
তদন্তের সূত্রপাত কোথা থেকে?
এই তল্লাশির সূত্রপাত ২০২০ সালের দিল্লির কয়লা পাচার মামলা থেকে। ওই মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত অনুপ মাঝি ওরফে লালার বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে ইডির নজরে আসে একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক যোগসূত্র। সেই তদন্তের অংশ হিসেবেই প্রতীক জৈনের বাড়ি ও আইপ্যাকের অফিসে অভিযান চালানো হয় বলে ইডির দাবি।
হাই কোর্টে মুখোমুখি দুই পক্ষ
ঘটনার পরেই তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তোলে, বিজেপি ইডিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভোটের কৌশল ও প্রার্থী তালিকা হাতানোর চেষ্টা করছে। সেই অভিযোগে ইডির অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টে আবেদন জানানো হয়।
অন্যদিকে, তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ইডিও পৃথক মামলা দায়ের করে। শুক্রবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে দুই মামলার শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তুমুল বিশৃঙ্খলার জেরে তা স্থগিত হয়ে যায়। আদালত জানায়, আগামী ১৪ জানুয়ারি এই মামলার শুনানি হবে।
সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি, রাজ্যের আগাম চাল
এরপর দ্রুত শুনানির দাবিতে প্রধান বিচারপতির এজলাসে ইমেল করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। এমনকি পৃথক বেঞ্চ গঠনের আবেদনও জানানো হয়। তবে সেই আবেদন খারিজ করে দেয় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। স্পষ্ট জানানো হয়, নির্ধারিত দিনেই শুনানি হবে।
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইডি—এমনটাই শোনা যাচ্ছে। তবে একতরফা শুনানি এড়াতে আগেভাগেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্যাভিয়েট দাখিল করা হয়েছে।
বড় প্রশ্ন কোথায় দাঁড়িয়ে?
এই ঘটনায় একাধিক সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন উঠে এসেছে—
- রাজ্য পুলিশ কি কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিককে গ্রেপ্তার করতে পারে?
- তল্লাশির সময় মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি কতটা সাংবিধানিক?
- কেন্দ্র বনাম রাজ্যের সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে?
উত্তর মিলবে আদালতের রায়ে। তবে তার আগে এই ইস্যু ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।



