Epstein Files : একদিকে মাসে মাসে স্কলারশিপের আশ্বাস, অন্যদিকে ঝলমলে জীবন আর মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন—এই দুই অস্ত্রকে ব্যবহার করেই বিশ্বের নানা প্রান্তে অসংখ্য তরুণী ও নাবালিকাকে ফাঁদে ফেলেছিল কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন। সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার বিচার দফতর যে বিপুল পরিমাণ নথি প্রকাশ্যে এনেছে, তা এই ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্কের অন্ধকার দিককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই তথাকথিত ‘এপস্টিন ফাইল’ শুধু অপরাধের প্রমাণই নয়, বরং দেখাচ্ছে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে বিশ্বাস অর্জন করে, ধীরে ধীরে মানসিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে শিকারদের সর্বনাশ করত এপস্টিন।
এপস্টিন ফাইল: লক্ষ লক্ষ পাতার ভয়াবহ দলিল
আমেরিকার বিচার দফতর সম্প্রতি প্রকাশ করেছে প্রায় ৩০ লক্ষ পাতা নথি, যার মধ্যে রয়েছে—
- প্রায় ২০০০টি ভিডিও
- ১ লক্ষ ৮০ হাজারের বেশি ছবি
- অসংখ্য সাক্ষ্য, মেসেজ, ই-মেল ও নোট
এই ফাইলগুলিতে উঠে এসেছে বহু নির্যাতিতার কাহিনি। কেউ প্রতারণার শিকার, কেউ ভয়ভীতির মাধ্যমে আটক, আবার কেউ আর্থিক ও সামাজিক প্রলোভনে ধীরে ধীরে জালে জড়িয়ে পড়েছিল।
অনিল অম্বানীর সঙ্গে যোগাযোগ: নথিতে কী উঠে এল?
এই ফাইলের এক অংশে উঠে এসেছে শিল্পপতি অনিল অম্বানীর নাম। নথি অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৯—এই সময়কালে এপস্টিন একাধিকবার অনিল অম্বানীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছিল।
নথি বলছে—
- ২০১৭ সাল থেকেই নিয়মিত মেসেজ চালাচালি
- ব্যবসা, বিশ্ব পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথোপকথন
- এমনকি সাক্ষাতের পরিকল্পনাও ছিল
সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি আসে একটি মেসেজ কথোপকথনে। নথি অনুসারে, ২০১৭ সালের ৯ মার্চ অনিল অম্বানী প্রশ্ন করেছিলেন—
“কাকে প্রস্তাব করছেন?”
এপস্টিনের উত্তর ছিল—
“দীর্ঘাঙ্গী এক সুইডিশ শ্বেতাঙ্গ মহিলা, দেখা করলে আনন্দ পাবেন।”
এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আসে উত্তর—
“ব্যবস্থা করুন।”
এই কথোপকথন কতটা বাস্তব সাক্ষাতে গড়িয়েছিল, তা নথিতে স্পষ্ট নয়। তবে শুধু এই বার্তাগুলিই এপস্টিনের কার্যকলাপের ভয়াবহ দিককে সামনে আনে।
‘জেন’-এর গল্প: প্রতারণার ধাপে ধাপে ফাঁদ
এপস্টিন ফাইলের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশগুলোর একটি হলো ‘জেন’ নামে এক নির্যাতিতার বয়ান।
প্রথম আলাপ ছিল একেবারেই সাধারণ। ধীরে ধীরে জেনের প্রশংসা করতে থাকে এপস্টিন। সে কতটা মেধাবী, ভবিষ্যতে কত দূর যেতে পারে—এইসব কথায় বিশ্বাস অর্জন করে নেয়।
এরপর আসে স্কলারশিপের প্রস্তাব। বলা হয়, এপস্টিনের নামাঙ্কিত একটি স্কলারশিপ রয়েছে, যা জেন সহজেই পেতে পারে। নথি অনুযায়ী, এই প্রতারণার বীজ প্রথম বপন করা হয় মিশিগানের একটি ক্যাম্পে।
পরবর্তী ধাপে—
- জেনের মায়ের সঙ্গে আলাপ
- ব্যবহার ও কথাবার্তায় পরিবারের বিশ্বাস অর্জন
- ফ্লরিডার পাম বিচে নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ
এরপর শুরু হয় আসল ভয়াবহতা।
টাকার বিনিময়ে ‘মালিশ’ থেকে ভয়ংকর নির্যাতন
প্রথমে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জেনকে ‘মালিশ’-এর কাজ করতে বলা হয়। তখনও সে বুঝতে পারেনি, এটি একটি গভীর অপরাধচক্রের অংশ।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলায়। জেন হয়ে ওঠে যৌন নির্যাতনের শিকার। নথি বলছে, প্রায় তিন বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছিল তাকে। এই সময়ের মধ্যে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছিল সে।
কতজন শিকার?
আমেরিকার বিচার দফতরের অনুমান অনুযায়ী—
- হাজারেরও বেশি মহিলা এপস্টিনের যৌন নির্যাতনের শিকার
- শুধু আমেরিকাতেই নয়, ইউরোপ ও পূর্ব ইউরোপেও বিস্তৃত ছিল এই নেটওয়ার্ক
কখনও অর্থের লোভ, কখনও স্কলারশিপ, আবার কখনও মডেলিং বা গ্ল্যামার দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদ পাতত এপস্টিন।
উপসংহার
এপস্টিন ফাইল কোনও একক অপরাধীর কাহিনি নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত, দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রতারণা ও নির্যাতনের নথি।
স্কলারশিপ, সম্মান, অর্থ ও প্রভাব—সবকিছুকে অস্ত্র বানিয়ে কীভাবে মানুষকে ভেঙে ফেলা যায়, তার নির্মম উদাহরণ এই ফাইল।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর একটাই প্রশ্ন উঠে আসছে—
এত বছর ধরে কীভাবে এই অপরাধচক্র আড়ালে রয়ে গেল?



