Makar Sankranti Gold Silver Rate : মকর সংক্রান্তির মরশুমেই সাধারণ মানুষের কপালে কার্যত চিন্তার ভাঁজ। নতুন বছরের শুরুতেই সোনা ও রুপোর দামে যে হারে আগুন লেগেছে, তাতে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কাছে এই মূল্যবান ধাতু যেন ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে যে মূল্যবৃদ্ধির ধারা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে তা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের শুরু থেকেই সোনা ও রুপোর দামে এমন রকেট গতি দেখা যাচ্ছে, যা অতীতে খুব কমই নজরে এসেছে।
বুধবার, সপ্তাহের তৃতীয় ব্যবসায়িক দিনে বাজার খুলতেই কার্যত চমকে যান বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে রুপোর দামে এক লাফে যে বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে, তা সমস্ত পুরনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। একই সঙ্গে সোনার দামও থামার কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে গয়না কেনার পরিকল্পনা যাঁরা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।
রুপোর দামে ইতিহাসের সর্বোচ্চ লাফ
মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (MCX) খুলতেই রুপোর দামে কার্যত বিস্ফোরণ ঘটে। ৫ মার্চ ডেলিভারির রুপোর ফিউচার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগের দিনের তুলনায় প্রায় ১২,৮০০ টাকার বেশি বেড়ে যায়। আগের ট্রেডিং সেশনে যেখানে প্রতি কেজি রুপোর দাম ছিল প্রায় ২,৭৫,১৮৭ টাকা, সেখানে বুধবার তা বেড়ে পৌঁছে যায় প্রায় ২,৮৭,৯৯০ টাকায়। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি রুপোর দামের লাইফটাইম হাই।
শুধু এক দিনের হিসাবেই নয়, গোটা বছরের পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৬ সালের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারি, প্রতি কেজি রুপোর ফিউচার দাম ছিল প্রায় ২,৩৫,৮৭৩ টাকা। মাত্র ১০টি ট্রেডিং দিনের মধ্যেই সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৮৭,৯৯০ টাকায়। অর্থাৎ, বছরের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত রুপোর দাম বেড়েছে প্রায় ৫২,০০০ টাকারও বেশি। শুধু চলতি সপ্তাহেই তিনটি ট্রেডিং দিনে প্রায় ১৯,০০০ টাকার বৃদ্ধি নজরে এসেছে।
সোনার দামেও নেই লাগাম
রুপোর পাশাপাশি সোনার বাজারেও একই ছবি। একের পর এক নতুন রেকর্ড গড়ছে হলুদ ধাতু। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই সোনার দামে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১ জানুয়ারি যেখানে ২৪ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ছিল প্রায় ১,৩৫,৮০৪ টাকা, সেখানে বুধবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৪৩,১৭৩ টাকায়।
মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৭,৩৬৯ টাকা। বুধবারের ট্রেডিং সেশনে একদিনেই প্রায় ৮০০ টাকার বেশি দাম বেড়েছে বলে বাজার সূত্রে খবর। গয়না শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের মতে, এমন দাম থাকলে আগামী দিনে বিয়ের মরশুমে বিক্রি আরও কমতে পারে।
কেন হঠাৎ এত দাম বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।
সাধারণত, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লেই সোনা ও রুপোর মতো মূল্যবান ধাতুকে ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে শেয়ার বাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে টাকা সরিয়ে সোনা ও রুপোয় বিনিয়োগ বাড়ে। চলতি বছরেও ঠিক সেটাই হচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের মাথায় হাত
এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর। বিয়ে, অন্নপ্রাশন বা উৎসব উপলক্ষে সোনা কেনার পরিকল্পনা করা বহু মানুষ এখন কার্যত দিশেহারা। গয়নার দোকানগুলিতেও ক্রেতার ভিড় তুলনামূলকভাবে কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন।
তবে বিনিয়োগকারীদের একাংশের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সোনা ও রুপো এখনও লাভজনক বিনিয়োগ হতে পারে। যদিও স্বল্পমেয়াদে দাম আরও বাড়বে নাকি সংশোধন আসবে, তা নিয়ে বাজারে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের শুরুতেই সোনা ও রুপোর বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারী—সকলকেই ভাবিয়ে তুলেছে। কোথায় গিয়ে থামবে এই মূল্যবৃদ্ধি, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আপাতত বিশ্ব পরিস্থিতির দিকেই তাকিয়ে বাজার বিশেষজ্ঞরা।



