Health Alert India : ২০২০ সালের সেই ভয়ংকর দিনগুলোর স্মৃতি এখনও মানুষের মনে দগদগে। করোনা মহামারী যে কতটা গভীর ক্ষত রেখে গেছে, তা আজও ভুলতে পারেনি বিশ্ব। ঠিক সেই আবহেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আরেকটি সংক্রমণ। ধীরে ধীরে মহামারীর রূপ নিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা ছুঁয়েছে ৩১ হাজারের বেশি, একের পর এক মৃত্যুর খবর পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
এই রোগটির নাম হেপাটাইটিস এ—একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যা সরাসরি মানুষের লিভারকে আক্রমণ করে। বর্তমানে ভারতের কেরল রাজ্যে এই রোগ উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও এখনও একে বৈশ্বিক মহামারী বলা যায় না, তবুও পরিস্থিতি যে অত্যন্ত গুরুতর, তা মানছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
📍 কেরলে কেন ভয়াবহ আকার নিচ্ছে হেপাটাইটিস এ?
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই কেরলে হেপাটাইটিস এ সংক্রমণের হার বাড়তে শুরু করে। সরকারি ও স্বাস্থ্য দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কেরলে মোট ৩১,৫৩৬ জন হেপাটাইটিস এ-তে আক্রান্ত হয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এখনও পর্যন্ত ৮২ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই সংখ্যা শুধু একটি রাজ্যের জন্যই নয়, গোটা দেশের জন্যই বড় সতর্কবার্তা।
🚰 দূষিত জল ও স্বাস্থ্যবিধির ব্যর্থতাই মূল কারণ?
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো পরিষ্কার পানীয় জলের অভাব ও স্বাস্থ্যবিধির চরম অবহেলা। কেরলের একাধিক জেলায় ভূগর্ভস্থ জল মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নোংরা জল ব্যবহার করেই রান্না, পান করা বা দৈনন্দিন কাজের ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে।
হেপাটাইটিস এ মূলত এমন এলাকাতেই বেশি ছড়ায়, যেখানে
- বিশুদ্ধ পানীয় জলের ঘাটতি
- অপরিষ্কার পরিবেশ
- অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা
এই তিনটি সমস্যা একসঙ্গে উপস্থিত থাকে।
👶 শুধু শিশু নয়, আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণরাও
আগে হেপাটাইটিস এ সাধারণত শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সংক্রমণের ধরণ দেখে চিকিৎসকরা চিন্তিত।
এখন কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী এমনকি প্রাপ্তবয়স্করাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
অনেক ক্ষেত্রে লিভারের উপর প্রভাব এতটাই গুরুতর হচ্ছে যে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ প্রাণঘাতী রূপও নিচ্ছে।
🦠 হেপাটাইটিস এ কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
হেপাটাইটিস এ একটি ভাইরাল লিভার সংক্রমণ, যার জন্য দায়ী HAV (Hepatitis A Virus)। এই ভাইরাস শরীরে ঢুকলে লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
সংক্রমণ ছড়ানোর প্রধান উপায়:
- দূষিত বা নোংরা জল পান করা
- সংক্রমিত ব্যক্তির রান্না করা খাবার খাওয়া
- অপরিষ্কার হাত দিয়ে খাবার গ্রহণ
- সংক্রমিত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি সংস্পর্শে থাকা
HAV ভাইরাস মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির মল ও রক্তে উপস্থিত থাকে।
🌍 বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য কী বলছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী—
- প্রতি বছর আনুমানিক ১৪ লক্ষ মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিস এ-র উপসর্গ দেখা যায়
- বাস্তবে প্রায় ১১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ সংক্রমিত হন, কিন্তু তাঁদের অনেকেরই কোনও উপসর্গ দেখা যায় না
- ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে ৭,১৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল এই রোগে
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, রোগটি অবহেলা করার মতো নয়।
🛡️ প্রতিরোধ ও সতর্কতা: এখনই যা করা জরুরি
হেপাটাইটিস এ সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি।
করণীয়:
✔️ শুধুমাত্র ফুটানো বা পরিশোধিত জল পান করুন
✔️ বাইরে খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন
✔️ খাবারের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে
✔️ পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল খাবার গ্রহণ করুন
✔️ অ্যালকোহল ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ এড়িয়ে চলুন
✔️ প্রয়োজনে হেপাটাইটিস এ ভ্যাকসিন নিন
🔎 উপসংহার
এখনই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে অবহেলা করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে। কেরলের অভিজ্ঞতা গোটা দেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা। পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায়।
২০২৬ সাল নতুন কোনও মহামারীর সাক্ষী হবে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু সাবধান থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।



