Birbhum News : ভালোবাসা কখনও কখনও এমন মোড় নেয়, যা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। বীরভূমের সাঁইথিয়ায় ঘটেছে একেবারে এমনই এক বিস্ময়কর ও আলোচিত ঘটনা — যেখানে এক স্বামী নিজেই ঘটা করে, সমস্ত সামাজিক রীতিনীতি মেনে, নিজের স্ত্রীর বিয়ে দিয়েছেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়। কেউ বলছেন, “এমন উদারতা আজকের সমাজে দৃষ্টান্ত।” আবার কেউ বলছেন, “এই ঘটনায় এক নতুন সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত রয়েছে।”
💔 দাম্পত্যে ফাটল, শুরু পরকীয়ার অধ্যায় :
প্রায় নয় বছর আগে সাঁইথিয়ার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাপি মণ্ডল-এর সঙ্গে বিয়ে হয় তারাপীঠের বাসিন্দা পঞ্চমী মণ্ডল-এর। বাপি পেশায় গাড়িচালক, আর পঞ্চমী একজন গৃহবধূ। তাঁদের সংসারে বছর আটের এক পুত্রসন্তানও রয়েছে।
তবে বিয়ের পরেই নাকি শুরু হয় অশান্তির ছায়া। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাপি ও পঞ্চমীর মধ্যে নিয়মিত মনোমালিন্য চলত। এই কলহ একসময় এমন জায়গায় পৌঁছায় যে, পঞ্চমী স্বামীর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন। এমনকি, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে একাধিক মামলা-ও হয় আদালতে।
অবশেষে সম্পর্কের টানাপোড়েন সামলাতে না পেরে পঞ্চমী চলে যান নিজের বাপের বাড়িতে। সেই সময়েই ঘটে যায় জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়।

❤️ স্বামীর বন্ধুত্ব থেকে প্রেমে পরিণতি :
পঞ্চমী যখন বাপের বাড়িতে থাকছেন, তখনই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় বাপির বন্ধু জিতকুমার মৃধা-র সঙ্গে। জিতের বাড়ি সাঁইথিয়ার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে। প্রথমদিকে সাধারণ কথাবার্তা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠতায় গড়ায়।
প্রায় নয় মাস ধরে চলতে থাকে পঞ্চমী ও জিতের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক। আশপাশের মানুষ ও আত্মীয়রা বিষয়টি টের পান। অবশেষে খবর পৌঁছায় বাপির কানে। কিন্তু চিরাচরিত মতো রাগ বা প্রতিশোধ নয় — বাপি নিলেন এমন এক সিদ্ধান্ত, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
🕉️ মন্দিরে বিয়ে — স্বামীর হাতেই স্ত্রীর নতুন জীবন শুরু :
সাঁইথিয়ার নন্দীকেশ্বরী মন্দিরে মঙ্গলবার সকালে ঘটে যায় সেই বিরল ঘটনা। বাপি নিজেই আয়োজন করেন স্ত্রীর বিয়ে। উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন আত্মীয় ও প্রতিবেশী।
সব নিয়ম মেনে মালাবদল, সিঁদুরদান ও পূজার্চনা-র মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিয়ে। বাপি দাঁড়িয়ে ছিলেন পাশে — যেন এক অভিভাবক, যিনি নিজের প্রিয় মানুষটিকে মুক্তি দিচ্ছেন নিজের বন্ধুর হাতে।
বিয়ের পর বাপি বলেন, “পঞ্চমী আমার সঙ্গে থাকতে চাইছে না। তাই আমি ওকে বেঁধে রাখতে চাই না। সে যদি জিতকে ভালোবাসে, তাহলে তাদের সংসার শুরু করা উচিত।”
এই কথার মধ্যেই প্রকাশ পায় এক অসাধারণ মানসিকতার মানুষ — যে নিজের কষ্টকে গোপন রেখে, অন্য দু’জনকে নতুন জীবন দিয়েছে।
⚖️ আইনি প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি
তবে এখানেই শেষ নয়। যদিও বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে সামাজিক রীতিতে, কিন্তু আইনি বিচ্ছেদ (Divorce) এখনও হয়নি। মামলাটি আদালতে চলমান।
বাপি জানিয়েছেন, “পঞ্চমী আদালতে যে মামলা করেছিল, সেটাও তুলে নেবে বলে জানিয়েছে। আইনি প্রক্রিয়াও খুব শিগগিরই শেষ হবে। আমি শুধু চাই, ওরা শান্তিতে থাকুক।”
এদিকে, পঞ্চমী ও জিতকুমার এখন মন্দিরের আশীর্বাদ নিয়ে নতুন জীবনের সূচনা করেছেন। তাঁদের বিয়ের ছবি ও ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, এবং এই ঘটনা এখন সাঁইথিয়ার চায়ের দোকান থেকে সোশ্যাল মিডিয়া পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

👶 সন্তান কার কাছে থাকবে?
প্রশ্ন উঠছে, বাপি ও পঞ্চমীর সন্তান এখন কার সঙ্গে থাকবে? বাপি জানিয়েছেন,
“আমাদের ছেলেটা এখন ছোট। ওকে আমি নিজের কাছেই রাখব। স্কুল, পড়াশোনা সব আমার তত্ত্বাবধানে হবে।”
স্থানীয়রা বলছেন, বাপি শুধু উদার নন, একজন দায়িত্ববান পিতা হিসেবেও এই পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন অত্যন্ত স্থিরভাবে।
🧩 সমাজের প্রতিক্রিয়া — কেউ প্রশংসা, কেউ সমালোচনা
ঘটনাটি সামনে আসতেই সাঁইথিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। কেউ বাপির এই সিদ্ধান্তকে “মানসিক পরিপক্বতা”র নিদর্শন বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি “সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়”।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঘটনা সমাজে এক নতুন প্রশ্ন তুলেছে — “মানুষ কি ভালোবাসার নামে সম্পর্কের সব সীমা ভাঙতে প্রস্তুত?”
স্থানীয় সমাজকর্মী শম্পা ঘোষের মন্তব্য, “বাপি মণ্ডলের কাজ মানবিক দিক থেকে প্রশংসনীয়, কিন্তু আইনি ও সামাজিকভাবে এটি এক জটিল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। সমাজে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।”

📜 একটা শিক্ষা — সম্পর্ক মানে অধিকার নয়, দায়িত্ব
বাপির সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে দিল, সম্পর্ক মানে সবসময় দখল নয়, কখনও কখনও মুক্তিই প্রকৃত ভালোবাসা।
তিনি যেভাবে সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে নিজের স্ত্রীর নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু একই সঙ্গে এটা এক গভীর প্রশ্নও রেখে যায় —
“প্রেমের জোরে ভাঙা সংসার কি শেষ পর্যন্ত সুখের হবে?” সময়ের কাছে সেই উত্তরই অপেক্ষা করছে।



