India Pakistan News : ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন করে চরম উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে। কূটনৈতিক চাপ, সীমান্ত উত্তেজনা ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যুর পর এবার জলনীতিকে হাতিয়ার করে আরও একধাপ কঠোর অবস্থান নিল নয়াদিল্লি। সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের পর এবার পাকিস্তানে প্রবাহিত ইরাবতী নদী-র অতিরিক্ত জলও বন্ধ করতে চলেছে ভারত। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পাকিস্তানে ভয়াবহ জলসঙ্কট ও খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পহেলগাঁও হামলার পর থেকেই কঠোর ভারতের অবস্থান
গত বছরের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারান ২৬ জন নিরীহ মানুষ। তদন্তে উঠে আসে, এই হামলার পিছনে পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠীর হাত রয়েছে। সেই ঘটনার পরই কূটনৈতিক স্তরে বড় সিদ্ধান্ত নেয় ভারত এবং সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা করা হয়।
এই সিদ্ধান্তেই যে ভারত থামছে না, তা স্পষ্ট করে দিলেন জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের জলসম্পদমন্ত্রী জাভেদ আহমেদ রানা। তিনি জানিয়েছেন, কাশ্মীর-পাঞ্জাব সীমান্তে দ্রুত গতিতে তৈরি হচ্ছে শাহপুর কান্দি বাঁধ। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ৩১ মার্চের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। বাঁধ সম্পূর্ণ হলেই পাকিস্তানে ইরাবতীর অতিরিক্ত জল প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে শাহপুর কান্দি বাঁধ?
একটি সাক্ষাৎকারে জাভেদ আহমেদ রানা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “দেশের স্বার্থেই এই জল আটকে রাখা প্রয়োজন। ইরাবতীর জল আর পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে না।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়া ও সাম্বা জেলা দীর্ঘদিন ধরেই খরা প্রবণ। স্থানীয় কৃষি ও পানীয় জলের চাহিদা মেটাতেই এই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পহেলগাঁও হামলার পর থেকেই শুধু ইরাবতী নয়, চন্দ্রভাগা নদী-র উপর চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। সরকারি সূত্রের দাবি, ২০২৭-২৮ সালের মধ্যেই এই প্রকল্পগুলি চালু হয়ে যাবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ সমর্থন
এই বাঁধ প্রকল্পে জোর দিয়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা শাহপুর কান্দি বাঁধ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। বরাদ্দ করা হয় প্রায় ৪৮৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে ভারতের পক্ষে বড় লাভ হবে। এতদিন পাকিস্তানে প্রবাহিত হওয়া ইরাবতীর জল ব্যবহার করে পঞ্জাবে প্রায় ৫,০০০ হেক্টর এবং জম্মু ও কাশ্মীরে ৩২,১৭৩ হেক্টর জমিতে সেচের সুবিধা মিলবে। অর্থাৎ, ভারতের কৃষি ও জল নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
আন্তর্জাতিক আদালতে পাকিস্তানের নালিশ, কিন্তু অনড় ভারত
সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্তান হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ দায়ের করেছে। আদালত দিল্লির কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছিল। তবে ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই আইনি প্রক্রিয়ার বৈধতা স্বীকার করে না। ফলে শুনানিতেও অংশ নেয়নি নয়াদিল্লি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান ভারতের আত্মবিশ্বাসকেই তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক মহলেও বার্তা স্পষ্ট—সন্ত্রাসবাদে মদত দিলে তার মূল্য দিতে হবে।
সিন্ধু জলচুক্তি: ইতিহাস ও বর্তমান সংকট
১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু জলচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের মধ্যে এই চুক্তি হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধুর পূর্ব দিকের তিন উপনদী—ইরাবতী, বিপাশা ও শতদ্রু ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অন্যদিকে, সিন্ধু, বিতস্তা ও চন্দ্রভাগার জল ব্যবহারের অধিকার পাবে পাকিস্তান। শর্ত ছিল, কেউই সম্পূর্ণভাবে জলপ্রবাহ আটকে রাখতে পারবে না।
কিন্তু চুক্তি স্থগিত থাকায় এখন পাকিস্তানের পঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে জলসেচ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষি নির্ভর করে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার উপর। ফলে জল সরবরাহ কমলে খাদ্য উৎপাদনে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।
ইসলামাবাদে দিশেহারা নেতৃত্ব
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। জল, খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট একসঙ্গে আঘাত হানলে পরিস্থিতি যে আরও জটিল হবে, তা বলাই বাহুল্য।
ভারতের সঙ্গে শত্রুতার মূল্য যে কতটা চড়া হতে পারে, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ইসলামাবাদ—এমনটাই মত কূটনৈতিক মহলের।
উপসংহার
জল কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এটি এখন শক্তিশালী কূটনৈতিক অস্ত্র। সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত ও ইরাবতীর জল বন্ধ করার সিদ্ধান্তে ভারত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—সন্ত্রাসবাদ ও শত্রুতার কোনও ছাড় নেই। এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।



