ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিহাসে আবারও এক উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হলো। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক রাজনৈতিক নেতার মন্তব্য ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ফের চাপে পড়েছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, অর্থাৎ ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লি কড়া বার্তা দিয়েছে ঢাকা সরকারকে।
সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট হওয়ার দিনক্ষণ ঘোষণা হয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া আরও অস্থির হয়ে উঠছে। এর মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার মন্তব্য—‘সেভেন সিস্টার্সকে ভারতীয় মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুঁশিয়ারি’—নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
‘সেভেন সিস্টার্স’ মন্তব্যে কড়া প্রতিক্রিয়া ভারতের
এই মন্তব্যকে ভারতের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত হিসেবেই দেখছে নয়াদিল্লি। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাকে তলব করেছে ভারত। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য বরদাস্ত করা হবে না।
শুধু কূটনৈতিক তলবেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘নিরাপত্তাজনিত কারণ’ দেখিয়ে ঢাকায় অবস্থিত ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (IVAC) সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। বুধবার দুপুর ২টো থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও কতদিন পর্যন্ত এই কেন্দ্র বন্ধ থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।

ভিসা পরিষেবা বন্ধে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
IVAC-এর তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে ভিসার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেছিলেন, তাঁদের নতুন তারিখ দেওয়া হবে। তবে ভিসা পরিষেবা বন্ধ হওয়ায় সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যেই উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই ভারত নির্ভরতা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের উপর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা
অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভারত থেকে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়, যার মধ্যে রয়েছে—
- খনিজ তেল ও জ্বালানি
- বিদ্যুৎ
- তুলা ও সুতা
- কৃষিজ পণ্য (চাল, পেঁয়াজ, ভুট্টা)
- ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস
- যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য
- গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স ও ভোগ্যপণ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যদি বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড়সড় ধাক্কা লাগতে পারে। এক কথায় বলতে গেলে, ভারত মুখ ফিরিয়ে নিলে বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ক্ষমতা এখন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তাঁর আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে মত অনেক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞের। অভিযোগ উঠছে, ক্ষমতায় এসে এই সরকার একদিকে দেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে।
তবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের একাংশের দাবি।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগে কূটনৈতিক উত্তাপ
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে অভিযোগ করা হয়, ভারতে বসে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উসকানিমূলক মন্তব্য করছেন এবং ভারত নাকি তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছে। এই অভিযোগের পর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়াতেই এবার দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করল ভারত। নয়াদিল্লি কার্যত বুঝিয়ে দিল—ভারতের ভূখণ্ড ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কোনও ধরনের মন্তব্য ভবিষ্যতে বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ ডেকে আনতে পারে।
নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে অস্থিরতা
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। বিক্ষিপ্ত হিংসার ঘটনাও সামনে আসছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যে ক্রমশ ভারতবিরোধী সুর শোনা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক মহলের প্রশ্ন—ভারতের সহায়তা ও সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘদিন চলা কি আদৌ সম্ভব বাংলাদেশের পক্ষে? কারণ ইতিহাস বলছে, সংকটের সময়ে ভারতই বহুবার বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।
‘সেভেন সিস্টার্স’ ইস্যুতে তৈরি হওয়া এই টানাপোড়েন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে কূটনীতি, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও। আগামী দিনে দুই দেশ কোন পথে এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মহলের।



