India Pakistan Tension : ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিল পাকিস্তান। চরম আর্থিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ধাক্কা সামলাতে না পারা এক বিপর্যস্ত দেশের মাঝেই এমন কড়া বার্তা দিলেন পাক সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। প্রশ্ন উঠছে—এই হুঁশিয়ারি কি বাস্তব কোনও সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত, নাকি দেশের ভিতরের ব্যর্থতা ঢাকতেই একেবারে ফাঁপা হুমকি?
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ভারতের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে দেশটি মোটেই নেই।
যুদ্ধ প্রস্তুতির দাবি পাক সেনাপ্রধানের
বহয়ালপুরের একটি সেনা শিবির পরিদর্শনে গিয়ে পাক সেনার সর্বাধিনায়ক আসিম মুনির দাবি করেন, ভবিষ্যতের যেকোনও আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য পাকিস্তানের সামরিক প্রস্তুতিতে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবেই ‘অপারেশন সিঁদুর’-পরবর্তী পরিস্থিতির উল্লেখ ছিল, যদিও নাম না করেই ভারতকে নিশানা করা হয়।
মুনির বলেন,
“পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখছি।”
এই বক্তব্য শুনে পাকিস্তানের ভিতরেই প্রশ্ন উঠছে—যে দেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থায় জর্জরিত, তারা আদৌ যুদ্ধের মতো ব্যয়বহুল পথে হাঁটার ক্ষমতা রাখে কি না।
নজিরবিহীনভাবে ক্ষমতা বৃদ্ধি আসিম মুনিরের
গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানের স্থলবাহিনীর প্রধান থেকে আসিম মুনিরকে সরাসরি সেনা সর্বাধিনায়ক বা ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারের আমলেই সংবিধান সংশোধন করে এই পদটি তৈরি করা হয়।
এর আগে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি শাখার উপর কোনও সর্বোচ্চ পদ ছিল না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেনার ওপর মুনিরের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করতেই এই পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। ক্ষমতা হাতে পেয়েই প্রথম ভাষণে ভারতকে নিশানা করে মুনির হুঁশিয়ারি দেন—
“ভারত যেন কোনও ভুল ধারণায় না থাকে। এ বার পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া হবে আরও দ্রুত এবং আরও কঠোর।”
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এই বক্তব্য যতটা আক্রমণাত্মক, তার বাস্তব ভিত্তি ততটাই দুর্বল।
চরম আর্থিক সংকটে পাকিস্তান
বর্তমানে পাকিস্তান ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার (IMF)-এর ঋণের উপর নির্ভরশীল দেশটি। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, ডলার সংকট চরমে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া।
এই অবস্থায় যুদ্ধের প্রস্তুতি মানে বিপুল আর্থিক ব্যয়। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পাকিস্তান প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। তুলনায় ভারত ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করার পরিকল্পনা করেছে।
সামরিক শক্তিতে কতটা এগিয়ে ভারত?
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের সামরিক শক্তির তালিকায় ভারত বর্তমানে শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চিনের পরে ভারতকে ধরা হচ্ছে চতুর্থ শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান অনেকটাই পিছনে—প্রায় ১২তম স্থানে।
সেনাসংখ্যার নিরিখে:
- ভারত: সক্রিয় সেনা প্রায় ১৪.৫ লক্ষের বেশি
- পাকিস্তান: সক্রিয় সেনা প্রায় ৬.৫ লক্ষ
রিজার্ভ বাহিনী ও আধাসামরিক শক্তির ক্ষেত্রেও ভারতের প্রাধান্য স্পষ্ট।
অস্ত্র ও প্রযুক্তিতে:
ভারতের হাতে রয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, অত্যাধুনিক মিসাইল সিস্টেম, শক্তিশালী নৌবহর ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষমতা। অন্যদিকে পাকিস্তান এখনও অনেকটাই বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল।
অপারেশন সিঁদুরের ধাক্কা এখনো কাটেনি
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপারেশন সিঁদুর পরবর্তী কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ পাকিস্তান এখনও পুরোপুরি সামলাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে পাকিস্তান ক্রমশ কোণঠাসা।
এই অবস্থায় যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে দেশের ভিতরের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা করছে পাক সেনা নেতৃত্ব—এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
ফাঁপা হুঁশিয়ারি না কি চাপের রাজনীতি?
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, বর্তমান বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার মতো ক্ষমতা বা পরিস্থিতি পাকিস্তানের নেই। আসিম মুনিরের বক্তব্য যতই কঠোর শোনাক না কেন, তা মূলত মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির কৌশল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারত সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের থেকে বহু যোজন এগিয়ে। ফলে এই হুঁশিয়ারি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে নয়, বরং চাপে পড়া একটি দেশের মরিয়া বার্তা হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক মহল।



