China Pakistan India : ভারতের সামরিক শক্তি আরও এক ধাপ এগোতে চলেছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগের পথে হাঁটছে কেন্দ্র সরকার, যার প্রভাব পড়তে চলেছে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে। সামরিক সূত্রের খবর, ভারত আরও বিপুল সংখ্যক রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা কার্যত চিন ও পাকিস্তানের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ঘনিষ্ঠ সূত্র অনুযায়ী, ভারতীয় বিমান বাহিনীর মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট (MRFA) প্রকল্পের অধীনে ফ্রান্সের তৈরি ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত হতে পারে। এই চুক্তির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকা, যা বাস্তবায়িত হলে এটি ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
ম্যাক্রোঁর ভারত সফরের আগেই বড় সিদ্ধান্ত?
সূত্রের খবর, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দিল্লি সফরের আগেই এই অস্ত্রচুক্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে পারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক আরও মজবুত করতেই এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই চুক্তির আওতায় শুধু যুদ্ধবিমান কেনাই নয়, বরং উচ্চমানের প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সংখ্যক রাফাল যুদ্ধবিমান এবং যন্ত্রাংশ ভারতেই তৈরি হবে, যা দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বড় সুযোগ।
কেন রাফালেই ভরসা ভারতের?
রাফাল ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য যুদ্ধবিমান হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম, স্টেলথ বৈশিষ্ট্য, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষমতা এবং একাধিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর কাছে রাফাল একপ্রকার ‘গেম চেঞ্জার’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই-ফ্রন্ট যুদ্ধ পরিস্থিতি, অর্থাৎ একসঙ্গে চিন ও পাকিস্তানের মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবেই এই বড় বিনিয়োগের পথে হাঁটছে ভারত। সীমান্তে চিনের বাড়তে থাকা সামরিক তৎপরতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাফাল চুক্তি হলে কী সুবিধা পাবে ভারত?
যদি এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়, তাহলে—
- ফ্রান্সের পর ভারতই হবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাফাল ব্যবহারকারী দেশ
- বিমান বাহিনীর আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে
- অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি ভারতীয় মাটিতে তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে
- আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্পের পথে বড় পদক্ষেপ হবে
ইতিমধ্যেই ভারতের হাতে রয়েছে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান, যেগুলির শেষ ‘সি’ ভেরিয়েন্টের ডেলিভারি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সম্পন্ন হয়েছে।
নৌবাহিনীর জন্যও রাফাল
শুধু বিমান বাহিনী নয়, ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তি বাড়াতেও রাফালের উপর ভরসা রেখেছে ভারত। নৌবাহিনীর জন্য ইতিমধ্যেই ৬৩,০০০ কোটি টাকার চুক্তিতে ২৬টি রাফাল এম (Marine) ভেরিয়েন্ট কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত—
- ৪টি টুইন-সিট ট্রেনার বিমান
- MRO (Maintenance, Repair and Overhaul) সুবিধা
- রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরো যন্ত্রাংশ সরবরাহ
- ভারতীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ
এই সমস্ত বিমান ২০৩০ সালের মধ্যেই ভারতের হাতে চলে আসবে বলে জানানো হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে রাফালের প্রমাণিত সাফল্য
অপারেশন ‘সিঁদুর’-এর সময় রাফাল যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা চোখে পড়ার মতো ছিল। সামরিক সূত্রের দাবি, ওই অভিযানে মোতায়েন রাফাল বিমানগুলি থেকে SCALP ক্রুজ মিসাইল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।
এই SCALP ক্ষেপণাস্ত্র—
- আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য
- প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম
- ইরাক যুদ্ধ ও লিবিয়া সংঘর্ষ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক অভিযানে পরীক্ষিত
এই অস্ত্র ব্যবস্থাই কার্যত শত্রুপক্ষের রণকৌশল ভেঙে দিতে সক্ষম বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
২০২৬-এ কি বড় কিছু আসছে?
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এত বড় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২০২৬ সালের মধ্যে ভারত আরও বড় কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারে। যদিও সরকারিভাবে এমন কোনও কথা বলা হয়নি, তবে রাফালের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানে বিপুল বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের বড় পরিকল্পনার দিকেই ইঙ্গিত করে।
উপসংহার
রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে এই সম্ভাব্য মেগা চুক্তি শুধু একটি অস্ত্র কেনাবেচার বিষয় নয়, বরং এটি ভারতের সামরিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে চিন ও পাকিস্তানের কৌশলগত হিসাব যে নতুন করে করতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।



