India US Trade Deal : শুল্ক কমেছে, বন্ধুত্বের বার্তা এসেছে—কিন্তু এর আড়ালে কি ভারতের বিরুদ্ধে বড় কোনও কৌশলগত চাল চালছে আমেরিকা? সাম্প্রতিক ইন্দো-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি ঘিরে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে। দীর্ঘদিনের টানাপড়েনের পর ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে বলেই দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু এই চুক্তি যতটা পরিষ্কার হওয়ার কথা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—ভারতের উপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রকাশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে ভারত ঠিক কী দিল? এবং সেই বিনিময় ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পক্ষে কতটা লাভজনক?
কেন ট্রাম্প একতরফা ঘোষণা করলেন?
বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে প্রথম বড় ঘোষণা আসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ। লক্ষণীয়ভাবে, এই ঘোষণার আগে বা পরে ভারত সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর তরফে কোনও বিস্তারিত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। সাধারণত বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ বিবৃতি, চুক্তির খসড়া বা অন্তত কার্যকর হওয়ার সময়সীমা জানানো হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তা হয়নি।
এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—চুক্তি যদি সত্যিই চূড়ান্ত হয়ে থাকে, তবে তার শর্তাবলী প্রকাশে এই গোপনীয়তা কেন?
রাশিয়ান তেল নিয়ে বিতর্ক
এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক সম্ভবত রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত নাকি রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আমেরিকা থেকে বেশি করে তেল ও শক্তি সংক্রান্ত পণ্য আমদানি করবে।
এর বদলে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের উপর আরোপ করা অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ‘পারস্পারিক শাস্তিমূলক শুল্ক’ প্রত্যাহার করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এর ফলেই নাকি ভারতের জন্য শুল্ক হার নেমে এসেছে ১৮ শতাংশে।
কিন্তু এখানে বড় প্রশ্ন—এই বিষয়ে ভারত সরকার এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই বলেনি। রাশিয়াও ভারতের তেল আমদানি বন্ধের বিষয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি। ফলে ট্রাম্পের দাবির বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
৫০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি?
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে ভারত আমেরিকা থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শক্তি, প্রযুক্তি, কয়লা, কৃষিজ পণ্যসহ বিভিন্ন সামগ্রী। ভারতীয় মুদ্রায় এই অঙ্ক প্রায় ৪৫ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।
এখানেই আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে—এই বিপুল আমদানি প্রতিশ্রুতি ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াবে কি না, দেশীয় শিল্প ও কৃষকের উপর চাপ সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-আমেরিকার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এতদিন চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল কৃষিপণ্যের বাজার খোলা নিয়ে ভারতের অনীহা। এখন প্রশ্ন উঠছে—এই চুক্তিতে কি সেই জায়গাতেই আপস করল ভারত?
কোথায় ধোঁয়াশা সবচেয়ে বেশি?
সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা হল, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি এখনও প্রকাশিত নয়। হোয়াইট হাউস থেকে কোনও ঘোষণাপত্র ফেডারেল রেজিস্টারে জারি করা হয়নি, যেখানে সাধারণত দুই দেশের বাণিজ্যচুক্তির বিস্তারিত শর্ত থাকে।
এছাড়াও অজানা রয়ে গেছে—
- চুক্তি কবে থেকে কার্যকর হবে
- কোন কোন পণ্যে শুল্ক ছাড় মিলবে
- ভারতের শুল্ক বাধা সত্যিই শূন্যে নামানো হবে কি না
- কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে
এই সব প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
রাজনীতি বনাম বাস্তবতা
চুক্তি ঘোষণার পর দেশে রাজনৈতিক উদযাপন শুরু হয়েছে। এনডিএ জোটের তরফে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে, সংসদে মালা পরিয়ে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল—যে চুক্তির শর্ত এখনও পরিষ্কার নয়, তার জন্য এত দ্রুত রাজনৈতিক কৃতিত্ব দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত?
বন্ধুত্বের বার্তা আর বাস্তব বাণিজ্য স্বার্থ—এই দুইয়ের ফারাক অনেক সময়েই বড় হয়। ট্রাম্পের মতো কট্টর বাণিজ্য-জাতীয়তাবাদী নেতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—ভারত কি কৌশলগত সুবিধা পেল, নাকি শুধু শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে বড় ছাড় দিল?
শেষ কথা
ইন্দো-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যতক্ষণ না চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশিত হচ্ছে, ততক্ষণ এটিকে নিঃশর্ত সাফল্য বলা কঠিন। শুল্ক কমা যেমন ইতিবাচক, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে ভারতের কৃষক, শিল্প ও জ্বালানি নিরাপত্তার উপর এর প্রভাব কী হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।



