IPAC Case ED vs TMC : আই-প্যাক (I-PAC) সংক্রান্ত ইডির অভিযান ঘিরে কলকাতা হাইকোর্টে বড় ধাক্কা খেল তৃণমূল কংগ্রেস। দীর্ঘ শুনানির পর তৃণমূলের করা আবেদন খারিজ করে দিল আদালত। উল্টে মান্যতা পেল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) যুক্তি ও বক্তব্য। ফলে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র চর্চা—এই রায়ের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর গিয়ে পড়বে? নাকি এই মামলার আইনি পরিসর এখানেই সীমাবদ্ধ?
কী এই আই-প্যাক কাণ্ড?
রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ঠিকানায় ইডির তল্লাশি ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। এই অভিযানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের দাবি ছিল, এই তল্লাশির আড়ালে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি সংক্রান্ত গোপন রাজনৈতিক তথ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৯ জানুয়ারি এই মামলার শুনানির সময় আদালত চত্বরে ভিড় ও বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিচারককে এজলাস ছাড়তে হয়। সেই কারণে শুনানি পিছিয়ে ১৪ জানুয়ারি ধার্য করা হয়েছিল।
আদালতে ইডির বক্তব্য কী ছিল?
মঙ্গলবার হাইকোর্টে ইডির তরফে জানানো হয়, আই-প্যাকের বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশির সময় তাদের কাজে বাধা দেওয়া হয়। ইডির অভিযোগ, আইন মেনে নথি খতিয়ে দেখতে গেলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয় এবং তদন্তের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস সরিয়ে ফেলা হয়।
ইডির আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, এই সব ঘটনা ঘটেছে রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিকদের উপস্থিতিতেই। যার ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। ইডির মতে, এটি শুধু তদন্তে বাধা নয়, বরং ন্যায়বিচারের পথেও অন্তরায় সৃষ্টি করেছে।
এখানেই থামেনি ইডি। আদালতে আরও দাবি করা হয়, অভিযানের সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই সেখানে উপস্থিত হয়ে নথি নিয়ে যান। এই অভিযোগ রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
তৃণমূলের পাল্টা অভিযোগ কী?
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে দাবি করা হয়, আই-প্যাক সংক্রান্ত অভিযানে ইডি বেআইনিভাবে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী তথ্য বাজেয়াপ্ত করেছে। দলের বক্তব্য, সমীক্ষা রিপোর্ট, ভোটার ডেটা, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কৌশল—যার সঙ্গে টাকা পাচার বা কোনও অপরাধের কোনও সম্পর্ক নেই—সেগুলি নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তৃণমূলের আইনজীবীরা আদালতে বলেন, এই সব তথ্য একটি রাজনৈতিক দলের গোপনীয় সম্পত্তি। এগুলি বাজেয়াপ্ত করা সাংবিধানিক গোপনীয়তার পরিপন্থী। তাঁদের অভিযোগ, এই অভিযান আদতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিরোধী দলকে হেনস্থা করার কৌশল।
কেন তৃণমূলের যুক্তি গ্রহণ করল না আদালত?
শুনানির সময় ইডির পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়—যদি সত্যিই নির্বাচনী তথ্য বাজেয়াপ্ত হয়ে থাকে, তবে মামলায় নির্বাচন কমিশনকে পক্ষ করা হয়নি কেন? পাশাপাশি ইডি স্পষ্টভাবে জানায়, তারা কোনও রাজনৈতিক বা নির্বাচনী তথ্য বাজেয়াপ্তই করেনি।
ইডির আরও দাবি, তৃণমূল যে হলফনামা জমা দিয়েছে, তাতে যিনি সই করেছেন, তিনি তল্লাশির সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না। ফলে ওই অভিযোগ অনুমাননির্ভর এবং আইনি দিক থেকে দুর্বল।
এই যুক্তিতেই আদালত মন্তব্য করে, তৃণমূলের আবেদনে আর বিচারযোগ্য কোনও বিষয় নেই। তাই সেই আবেদন খারিজ করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় কী?
শুনানির শেষে কলকাতা হাইকোর্ট জানায়, ইডির বক্তব্য অনুযায়ী আই-প্যাকের অফিস বা সংস্থার ডিরেক্টরের বাড়ি—কোনও জায়গা থেকেই কোনও নথি, হার্ডডিস্ক বা ডিজিটাল তথ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। তৃণমূল এই বক্তব্য আদালতের নথিতে উল্লেখ করার আবেদন জানালেও, আদালত জানায় যে মামলাটিতে আর কিছু বিচারাধীন নেই।
তবে ইডির করা পৃথক আবেদন পরবর্তী শুনানির জন্য মুলতুবি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আদালত উল্লেখ করে, এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কিছু বিষয় ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
রাজনৈতিক প্রভাব কতটা?
আইনি দিক থেকে এই মামলায় আপাতত তৃণমূলের আবেদন শেষ হলেও, রাজনৈতিক দিক থেকে বিতর্ক আরও গভীর হল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে ইডির অভিযোগ এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে এই রায়ের প্রভাব বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিতে কতটা ছায়া ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।



