Iran protest 2026 : বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে কি বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে? পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ ইরানে চলমান গণবিক্ষোভ ঘিরে সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে, তা আগের সব আন্দোলনের তুলনায় অনেক বেশি গভীর ও বিস্তৃত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। শুধু রাজনৈতিক বার্তাই নয়, তার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতির কথাও উঠে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সরকারি সূত্রের উল্লেখ করে জানিয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য আকাশপথে হামলার প্রাথমিক ছক তৈরি করা হয়েছে। কোন কোন সামরিক ঘাঁটি বা কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, সেই তালিকাও নাকি প্রস্তুত।
ইরানে বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। ২০০৯ সালে নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলন, ২০২২-২৩ সালে মহিলাদের নেতৃত্বে হিজাব-বিরোধী প্রতিবাদ—সব ক্ষেত্রেই সরকার কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া বর্তমান আন্দোলনটি একাধিক কারণে ব্যতিক্রমী। এবার এই প্রতিবাদের কেন্দ্রে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী বা ছাত্র সংগঠন নেই। রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ—ব্যবসায়ী, শ্রমিক, গৃহবধূ থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্ম।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি ও ভিডিও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলেছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে তরুণীরা প্রকাশ্যে আয়াতোল্লাহ খামেনেইয়ের ছবি পুড়িয়ে সেই আগুন থেকেই সিগারেট ধরাচ্ছেন। ইরানের মতো কট্টর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থায় এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতীকী প্রতিবাদই বুঝিয়ে দিচ্ছে ভয়ভীতির দেওয়াল ভাঙতে শুরু করেছে।
ইরানে ইসলামিক শাসনের সূচনা হয়েছিল শাহ রাজপরিবারের পতনের পর, আশির দশকের গোড়ায়। তারপর চার দশকের বেশি সময় ধরে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও সামরিক শক্তির জোরে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। বহুবার ক্ষোভ দানা বেঁধেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগে তা দমন করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এ বার কি সেই পুরনো কৌশল কাজ করবে?
বর্তমান আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক রিপোর্ট বলছে, গত এক বছরে ইরানে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ৫০ শতাংশের বেশি। ইরানিয়ান রিয়ালের মূল্য এতটাই কমে গিয়েছে যে সাধারণ মানুষের রোজকার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। চাকরির অভাব, জ্বালানির সংকট ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই আন্দোলনের সূচনা কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে নয়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের বাজার এলাকায় প্রথম ক্ষোভ প্রকাশ পায়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে ইরানের একাধিক শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলে। অর্থাৎ, এই প্রতিবাদ শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—গ্রামাঞ্চলেও তার প্রভাব পড়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ইরান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি চাপে। দীর্ঘদিনের মার্কিন ও পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি কার্যত বিপর্যস্ত। তার উপর ২০২৫ সালে আমেরিকার সামরিক অভিযানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বড় ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ফলে কূটনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ছে তেহরানের উপর।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনার দিকেও নজর রাখছেন বিশ্লেষকরা। সেখানে সেনা অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। অনেকের ধারণা, ইরানের ক্ষেত্রেও তেমন কোনও ‘রেজিম চেঞ্জ’ অপারেশন নিয়ে ভাবনা চলছে ওয়াশিংটনে। ট্রাম্পের মন্তব্য সেই জল্পনাকেই উসকে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ঘরে-বাইরে প্রবল চাপের মুখে ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দমন হবে, নাকি ২০২৬ সাল ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় মোড় নিয়ে আসবে—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এটুকু স্পষ্ট, এ বারকার বিক্ষোভ আগের মতো সহজে উপেক্ষা করার মতো নয়।



