Live In Relationship : লিভ-ইন রিলেশনশিপ মানেই দায়বদ্ধতা নেই—এই ধারণা এবার আইনি ভাবে ভেঙে পড়ল। সম্পর্ক ভালো না লাগল, তাই হঠাৎ সব ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া—এমন সিদ্ধান্ত আর একতরফাভাবে নেওয়া যাবে না। বিশেষ করে যদি সেই সম্পর্কে নারী সঙ্গী প্রতারিত হন বা আর্থিকভাবে অসহায় অবস্থায় পড়েন, তাহলে পুরুষ সঙ্গীর দায় এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই। স্পষ্ট ভাষায় এই বার্তাই দিল Allahabad High Court।
আদালতের এই যুগান্তকারী রায়ে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো একত্রে বসবাস করা কোনও যুগল লিভ-ইন সম্পর্কে থাকলে, বিচ্ছেদের পর নারী সঙ্গী খোরপোশ বা ভরণপোষণের অধিকারী হবেন। এক্ষেত্রে বিয়ের আনুষ্ঠানিক আইনি নথি না থাকলেও তা কোনও বাধা নয়। অর্থাৎ, লিভ-ইন সম্পর্ককে আর হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।
কী বলছে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ?
হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও পুরুষ যদি দীর্ঘ সময় ধরে কোনও নারীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করেন এবং সমাজের সামনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন, তবে সেই সম্পর্কের দায় স্বীকার করতেই হবে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ওই নারীকে আর্থিকভাবে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে নতুন জীবন শুরু করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালতের মতে, লিভ-ইন রিলেশনশিপ কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, বরং এতে সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাও জড়িত। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে পুরুষ সঙ্গী ইচ্ছাকৃতভাবে নারী সঙ্গীকে ঠকিয়েছেন, তাহলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে।
মামলার সূত্রপাত কোথা থেকে?
এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত উত্তরপ্রদেশের Moradabad জেলা থেকে। সেখানকার এক মহিলা দীর্ঘদিন ধরে এক রেলকর্মী তথা লোকো পাইলটের সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে থাকতেন এবং পাড়া-প্রতিবেশীর কাছেও নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই পরিচয় দিতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের পর ওই মহিলা আর্থিক সংকটে পড়েন এবং ভরণপোষণের দাবিতে মুরাদাবাদের নিম্ন আদালতের দ্বারস্থ হন।
নিম্ন আদালতের রায় ও হাইকোর্টের সিলমোহর
নিম্ন আদালত সমস্ত নথি, সাক্ষ্য ও পরিস্থিতি বিচার করে নির্দেশ দেয় যে, সংশ্লিষ্ট লোকো পাইলটকে তাঁর প্রাক্তন লিভ-ইন সঙ্গিনীকে নিয়মিত খোরপোশ দিতে হবে। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আবেদন জানানো হলে, হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—
🔹 দীর্ঘদিন একত্রবাস
🔹 সমাজে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়
🔹 আর্থিক ও মানসিক নির্ভরতা
এই তিনটি বিষয় প্রমাণিত হলে, লিভ-ইন সম্পর্ক কার্যত বিবাহিত সম্পর্কের সমতুল্য হিসেবেই বিবেচিত হবে।
বিয়ে ছাড়াও খোরপোশ—কীভাবে সম্ভব?
অনেকের মনেই প্রশ্ন—বিয়ে না হলে খোরপোশ কীভাবে? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী, কোনও নারী যদি প্রতারণার শিকার হন এবং আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে আদালত তাঁকে সুরক্ষা দিতে পারে।
এই রায় সেই আইনি অবস্থানকেই আরও শক্ত ভিত দিল। আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, খোরপোশ পাওয়ার জন্য শুধুমাত্র বিয়ের সার্টিফিকেটই শেষ কথা নয়। বাস্তব জীবন ও সামাজিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সমাজে এর প্রভাব কী হতে পারে?
এই রায়ের ফলে লিভ-ইন সম্পর্কে প্রবেশ করার আগে দু’পক্ষকেই এখন আরও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে পুরুষদের জন্য বার্তা পরিষ্কার—
👉 লিভ-ইন মানে ‘দায়হীন সম্পর্ক’ নয়
👉 একতরফা সিদ্ধান্তে সম্পর্ক ছাড়া যাবে না
👉 সঙ্গিনীকে ঠকালে আইনি শাস্তি অনিবার্য
আইনজ্ঞদের মতে, এই রায় লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা বহু নারীর জন্য একটি বড় সুরক্ষাকবচ। যাঁরা দীর্ঘ সম্পর্কের পর প্রতারিত হন বা সামাজিক স্বীকৃতি না পেয়ে সমস্যায় পড়েন, তাঁদের জন্য এই রায় নিঃসন্দেহে আশার আলো।
শেষ কথা
লিভ-ইন সম্পর্ক আধুনিক সমাজের বাস্তবতা। তবে সেই সম্পর্কে দায়বদ্ধতা ও ন্যায্যতা থাকা জরুরি। Allahabad High Court-এর এই রায় স্পষ্ট করে দিল—সম্পর্কে প্রবেশ যেমন সহজ, তেমনই তার দায় এড়ানো আর সহজ নয়। এখন প্রশ্ন একটাই—এই রায় কি ভবিষ্যতে লিভ-ইন সম্পর্কের চরিত্র বদলে দেবে? উত্তর দেবে সময়।



