মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিনেই ভয়াবহ আতঙ্কে কেঁপে উঠল গোটা স্কুল চত্বর। আচমকা বিকট শব্দ, মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় ঢেকে গেল এলাকা, দিশেহারা হয়ে পড়ল পরীক্ষার্থীরা। যাদের হাতে তখন প্রশ্নপত্র, চোখে-মুখে ছিল শুধু ভয় আর অনিশ্চয়তা। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচল শত শত ছাত্রছাত্রী। পরীক্ষার প্রথম দিনেই এমন ভয়ঙ্কর ঘটনার সাক্ষী থাকতে হবে—তা কেউ কল্পনাও করেনি।
ঘটনাটি ঘটেছে কোচবিহারের তুফানগঞ্জের ১ নম্বর ব্লকের নাককাটিগাছ হাইস্কুলে। মাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীনই স্কুলের ভিতরে মিড ডে মিল রান্নার সময় ভয়াবহভাবে বিস্ফোরিত হয় একটি গ্যাস সিলিন্ডার। এই ঘটনায় অন্তত ২০০ জন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী অল্পের জন্য রক্ষা পায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কেঁপে ওঠে গোটা স্কুল চত্বর এবং আশপাশের এলাকা।
কীভাবে ঘটল এই ভয়ঙ্কর ঘটনা?
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সকালে স্কুলে নিয়মিতভাবেই মিড ডে মিলের রান্না চলছিল। সেই সময় আচমকা রান্নাঘরের গ্যাস পাইপে লিক ধরা পড়ে। প্রথমে গ্যাস বের হতে শুরু করে, তারপর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ধরে যায়। পরিস্থিতি বুঝে স্কুলের কর্মীরা দ্রুত সিলিন্ডারটি রান্নাঘর থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন।
পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সিলিন্ডারটি স্কুলের মাঠে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেই ঘটে যায় বিপত্তি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয় গ্যাস সিলিন্ডারের। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা, ধোঁয়ায় ঢেকে যায় স্কুল চত্বর।
আতঙ্কে পরীক্ষার্থীরা, দৌড়ে আসেন অভিভাবকেরা
বিস্ফোরণের শব্দ শুনে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে। কেউ কেউ ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলে, আবার কেউ দৌড়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। স্কুলের বাইরে অপেক্ষারত অভিভাবকরাও বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ছুটে আসেন ভেতরে। অনেকের চোখে-মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা।
স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনাস্থলে ভিড় জমান। গোটা এলাকা জুড়ে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। তবে দ্রুত শিক্ষকেরা পরিস্থিতি সামাল দেন। পরীক্ষার্থীদের বোঝানো হয় যে তারা নিরাপদ রয়েছে। কিছু সময়ের মধ্যেই শিক্ষকদের আশ্বাসে ছাত্রছাত্রীরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
ফের শুরু পরীক্ষা, তৎপর প্রশাসন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর আবারও পরীক্ষা শুরু হয়। যদিও অনেক পরীক্ষার্থীর মধ্যেই আতঙ্কের রেশ থেকে যায়। তবুও জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার কথা ভেবে তারা আবার প্রশ্নপত্রে মন দেয়।
এই ঘটনার খবর পৌঁছায় পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদে। পর্ষদের আধিকারিকরা দ্রুত স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং গোটা ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট চান। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, এটি কোনও নাশকতার ঘটনা নয়, বরং চরম অসাবধানতা ও নিরাপত্তার অভাব থেকেই এই বিপত্তি ঘটেছে।
প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে
মাধ্যমিক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্কুল চত্বরে এমন দুর্ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। একদিকে যেখানে পরীক্ষার্থীদের মানসিক স্থিরতা সবচেয়ে জরুরি, সেখানে এমন ঘটনা তাদের উপর ভয়াবহ মানসিক চাপ তৈরি করেছে।
অভিভাবকদের একাংশের প্রশ্ন—
👉 পরীক্ষা চলাকালীন কেন মিড ডে মিল রান্না চলবে?
👉 কেন আগে থেকেই গ্যাস সিলিন্ডার ও রান্নাঘরের নিরাপত্তা খতিয়ে দেখা হয়নি?
রাজ্যজুড়ে মাধ্যমিক, একাধিক চ্যালেঞ্জ প্রশাসনের সামনে
উল্লেখ্য, সোমবার থেকেই শুরু হয়েছে চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হবে আগামী ১২ তারিখ। প্রতিদিন সকাল ১০টা ৪৫ থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত চলছে পরীক্ষা। রাজ্যজুড়ে প্রায় লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
পরীক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য রাজ্য সরকারের তরফে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিবহণ দপ্তর কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে অতিরিক্ত বাস চালাচ্ছে। প্রায় ১৫টি রুটে কুড়িটিরও বেশি অতিরিক্ত বাস নামানো হয়েছে।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রগুলিতে একটি বড় সমস্যা হাতির আনাগোনা। সেই কারণে বনদপ্তরের তরফে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে পরীক্ষার্থীরা নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছতে পারে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে নাককাটিগাছ হাইস্কুলের এই ঘটনা একদিকে যেমন বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করেছিল, তেমনই আবার অল্পের জন্য প্রাণরক্ষা হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন সবাই। তবে এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিল—মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ে ছোট অসাবধানতাও কতটা বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
এখন দেখার, এই ঘটনার পর প্রশাসন ও শিক্ষা দপ্তর ভবিষ্যতে কী ধরনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।



