Venezuela Crisis : বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও ভয়ঙ্কর উত্তেজনার পারদ চড়ল। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে দেশছাড়া করা হয়েছে—এমনই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু দাবি করেই থামেননি, কার্যত ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের মতো অভিযান’ চালানোর কথাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন তিনি। এই বক্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে লাতিন আমেরিকা, রাশিয়া, চিন সহ বিশ্বের একাধিক শক্তিধর দেশে।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে গভীর রাতে এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি তিনি জানান, সেই সময় মাদুরো তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ব্যক্তিগত কক্ষে ছিলেন। গোটা শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অন্ধকার নামানো হয়, যাতে অভিযানে কোনও বাধা না আসে। এই অভিযানের নাম না জানালেও ট্রাম্প একে আমেরিকার ইতিহাসের “সবচেয়ে সাহসী এবং সফল অপারেশন” বলে উল্লেখ করেছেন।
ফ্লরিডার মার-আ-লাগো থেকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন,
“আমরা যা করেছি, তা বিশ্বের কোনও দেশ কল্পনাও করতে পারেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার সামরিক শক্তিকে কার্যত অচল করে দেওয়া হয়েছিল। রাতের অন্ধকারে আমাদের বাহিনী নিখুঁতভাবে কাজ করেছে।”
পুরনো শত্রুতা, নতুন বিস্ফোরণ
মাদুরো ও ট্রাম্পের সংঘাত নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মাদক পাচার, তেল চোরাচালান এবং জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ তুলে আসছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ অবৈধভাবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রকে মদত দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়াও, ভেনেজুয়েলা থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আমেরিকায় প্রবেশ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল। ২০১৩ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে লক্ষ লক্ষ ভেনেজুয়েলান নাগরিক দেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন। ট্রাম্প বরাবরই এই অভিবাসন প্রবণতার ঘোর বিরোধী।
তবে কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এত বড় সামরিক অভিযান ছাড়া কি সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল না? আলোচনার টেবিলে বসে কি সমাধান বের করা যেত না—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে।
লাতিন আমেরিকা ক্ষুব্ধ, রাশিয়া-চিনের কড়া বার্তা
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে একাধিক লাতিন আমেরিকার দেশ। অনেকেই একে সরাসরি সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন। ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোর কূটনৈতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে রাশিয়া ও চিনের তরফে। মস্কো স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, কোনও আন্তর্জাতিক অনুমতি ছাড়া এই ধরনের অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রকের মতে, “এই ধরনের আগ্রাসন বিশ্বকে আরও অস্থির করে তুলবে।”
চিনও একই সুরে নিন্দা করেছে। বেইজিং জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসংঘের নীতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি চিনের।
২০২৬ কি বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত?
বিশ্লেষকদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, এই ঘটনার রেশ গড়াতে পারে আরও ভয়ঙ্কর দিকে। যদি চিন বা রাশিয়া সরাসরি কোনও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আমেরিকার প্রভাববলয় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্পের একতরফা আধিপত্যবাদী নীতিই হয়তো বিশ্বকে ধীরে ধীরে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আবার অন্য একদল বিশেষজ্ঞের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করতে চাইছেন, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দিতে। তবে প্রশ্ন উঠছে—এই শক্তি প্রদর্শনের মূল্য কি বিশ্বকেই দিতে হবে?
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
মাদুরো সত্যিই বন্দি হয়েছেন কি না, বা তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে—এই বিষয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। ভেনেজুয়েলার সরকারি মহলও সরাসরি কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই ঘটনা শুধুমাত্র দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যকেই নাড়া দিয়ে দিল। ২০২৬ সাল কি তবে নতুন কোনও বড় সংঘাতের বছর হতে চলেছে? নাকি শেষ মুহূর্তে কূটনীতির পথেই ফিরবে বিশ্ব—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



