Thursday, January 15, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটমহাশ্বেতা দেবীর স্বপ্নের স্কুল আজ জঙ্গলের আড়ালে , অবহেলায় বিলুপ্তির পথে শিক্ষা...

মহাশ্বেতা দেবীর স্বপ্নের স্কুল আজ জঙ্গলের আড়ালে , অবহেলায় বিলুপ্তির পথে শিক্ষা কেন্দ্র !

প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী শুধুমাত্র কলমের জোরে নয়, কাজের মাধ্যমেও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার শবর জনজাতির উন্নতি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জীবনের একটি বড় সময় তিনি এই জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় কাটিয়েছেন, শবর সম্প্রদায়ের মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়েছেন এবং তাঁদের অধিকার ও শিক্ষার জন্য নিরলস লড়াই চালিয়েছেন।

আজ সেই মহাশ্বেতা দেবীর হাত ধরে গড়ে ওঠা একটি বিদ্যালয় পড়ে রয়েছে চরম অবহেলায়—ঘন জঙ্গলের ভিতরে, কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়ার পথে।


প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে শুরু হয়েছিল পথচলা

পুরুলিয়া জেলার কাশীপুর বিধানসভার অন্তর্গত মতিপুর গ্রাম। এই গ্রামের শবর জনজাতির শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে মহাশ্বেতা দেবীর উদ্যোগে একটি বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। সেই সময় প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ ছিল প্রায় নেই বললেই চলে। মহাশ্বেতা দেবী বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনও সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়।

তাঁর প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় গ্রামের মধ্যেই শুরু হয়েছিল এই স্কুল, যেখানে শবর সম্প্রদায়ের শিশুরা প্রথমবারের মতো নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিল।


১৫ বছর সচল থাকলেও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় স্কুল

এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও তৎকালীন শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র মাহাতো। তিনি জানিয়েছেন,

“মহাশ্বেতা দেবীর ইচ্ছাতেই এই স্কুলের জন্ম। প্রথম দিন থেকেই আমি এখানে শিক্ষকতা করেছি। প্রায় ১৫ বছর ধরে নিয়মিতভাবে স্কুল চলেছে।”

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে শবর সম্প্রদায়ের শিশুরা ধীরে ধীরে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। অনেক পরিবার জীবিকার তাগিদে শিশুদের কাজে নামিয়ে দেয়। এর ফলেই একসময় ছাত্রসংখ্যা এতটাই কমে যায় যে বিদ্যালয়টি বন্ধ করে দিতে হয়।


আজ জঙ্গলে ঢেকে যাওয়া পরিত্যক্ত ভবন

বর্তমানে বিদ্যালয়টির চেহারা দেখলে মন ভারী হয়ে ওঠে। মতিপুর গ্রামের ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এই স্কুল ভবনটি এখন ঝোপঝাড়ে ঢাকা, চারপাশে আগাছা ও জঙ্গল। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে কোনওদিন এখানে শিশুদের কোলাহল, পড়ার শব্দ, খেলার হাসি শোনা যেত।

স্থানীয়দের কথায়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির অবস্থাও ধীরে ধীরে নাজুক হয়ে পড়ছে। যদি দ্রুত কোনও উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে এই বিদ্যালয় ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।


নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছেন পঞ্চায়েত প্রধান

এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছেন হুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সন্দীপ সিং সর্দার। তিনি জানিয়েছেন, মতিপুর গ্রামে এখনও শবর জনজাতির একাংশ মানুষ বসবাস করেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষিত ব্যক্তি রয়েছেন।

সন্দীপ সিং সর্দারের কথায়,

“গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, এখনও এখানে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষিত মানুষদের সহযোগিতা নিয়ে আবার শিশুদের পড়াশোনার পথে ফেরানো সম্ভব।”


মহাশ্বেতা দেবীর স্বপ্নকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা

পঞ্চায়েত প্রধান আরও জানান,

“মহাশ্বেতা দেবীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই স্কুল থেকেই আবার শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই আমার স্বপ্ন।”

বিদ্যালয় ভবনের সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রাথমিক পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষক নিয়োগের বিষয়েও তিনি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই স্কুল শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি মহাশ্বেতা দেবীর সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক।


শিক্ষার আলো ফিরলে বদলাতে পারে শবর সমাজের ভবিষ্যৎ

শবর জনজাতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা আজও সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এই বিদ্যালয় পুনরায় চালু হলে—

  • শিশুদের স্কুলমুখী করা সম্ভব হবে
  • শিশু শ্রমের প্রবণতা কমবে
  • সমাজে সচেতনতা বাড়বে
  • মহাশ্বেতা দেবীর স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে

স্থানীয় মানুষদের আশা, প্রশাসন ও সমাজ একসঙ্গে উদ্যোগ নিলে এই স্কুল আবার প্রাণ ফিরে পাবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments