SIR Harassment Allegation : SIR শুনানিকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে যে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা যেন প্রতিদিন নতুন নতুন মাত্রা নিচ্ছে। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে একের পর এক নোটিশ, বারবার শুনানিতে হাজিরার নির্দেশ এবং কাগজপত্র নিয়ে চূড়ান্ত বিভ্রান্তি—এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সেলিব্রেটি, শিল্পী, সমাজের পরিচিত মুখ—কেউই বাদ যাচ্ছেন না এই প্রক্রিয়ার চাপ থেকে। আর এই আবহেই মালদা থেকে উঠে এল এক এমন ঘটনা, যা গোটা রাজ্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে শেষ পর্যন্ত দাদুর কবরের মাটি হাতে নিয়ে শুনানি কেন্দ্রে হাজির হলেন এক যুবক। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের উদ্দেশে তাঁর সাফ বক্তব্য—এতেও যদি বিশ্বাস না হয়, তবে ডিএনএ পরীক্ষা করা হোক। এই ঘটনা এখন শুধুই একটি বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ নয়, বরং SIR শুনানিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের চরম অসহায়তার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে মালদা জেলার হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকায়। যুবকের নাম সালেক। নির্ধারিত শুনানির দিনে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাজির হন শুনানি কেন্দ্রে। তাঁর হাতে ছিল একটি ব্যাগ। প্রথমে অনেকেই বুঝতে পারেননি, সেই ব্যাগে আসলে কী রয়েছে। প্রশ্ন করতেই সালেক জানান, ব্যাগে রয়েছে তাঁর দাদুর কবরের মাটি। তাঁর দাবি, এতদিন ধরে নানা সরকারি নথি, পরিচয়পত্র, ভোটার কার্ড, আধার—সব জমা দিয়েও যখন তাঁরা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না, তখন নিজেদের শিকড়ের প্রমাণ হিসেবেই তিনি দাদুর কবরের মাটি নিয়ে এসেছেন।
সালেকের অভিযোগ, সমস্ত বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের তরফে তাঁর গোটা পরিবারকে SIR শুনানির নোটিশ পাঠানো হয়েছে। দিনের পর দিন কাজকর্ম ছেড়ে শুনানিতে হাজির হতে হচ্ছে। বারবার একই প্রশ্ন, একই সন্দেহ—এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তাঁরা। ক্ষোভ উগরে দিয়ে সালেক বলেন, “আমরা যদি এই দেশের মানুষ না হই, তাহলে আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর এই মাটিতে কেন? প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা করা হোক।”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্রুতই রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব অভিযোগ তোলে, SIR শুনানির নামে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু মানুষদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, নির্বাচন কমিশন বিজেপির ইশারায় কাজ করছে এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় মানুষকে বেছে বেছে হয়রানি করা হচ্ছে। মালদার এই ঘটনা সেই অভিযোগকেই আরও জোরালো করছে বলে মত শাসকদলের।
শুনানি কেন্দ্রে এই ঘটনার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে শাসক দলের কর্মীদের বচসা শুরু হয়। কোথাও কোথাও ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। কিছু সময়ের জন্য শুনানি কেন্দ্রের কাজ ব্যাহত হয় বলেও জানা গিয়েছে।
এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য একজন মানুষকে আর কতটা অপমান, কতটা মানসিক চাপ সহ্য করতে হবে? কাগজপত্রের গণ্ডি পেরিয়ে যখন মানুষকে স্মৃতি, আবেগ এবং আত্মপরিচয়ের শেষ চিহ্নটুকুও সামনে আনতে বাধ্য করা হচ্ছে, তখন এই প্রক্রিয়ার মানবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, SIR শুনানির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতি রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হলে তার প্রভাব পড়বে সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর। মালদার এই ঘটনা সেই অস্বস্তিরই নগ্ন প্রকাশ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দাদুর কবরের মাটি হাতে নিয়ে দাঁড়ানো সেই যুবকের ছবি আজ শুধুই একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদ নয়। এটি হাজার হাজার সাধারণ মানুষের ভয়, ক্ষোভ ও অসহায়তার প্রতিচ্ছবি। SIR শুনানিকে ঘিরে বিতর্ক যে আগামী দিনে আরও তীব্র হবে, তা এখনই স্পষ্ট।



