Mamata BanerjeeDelhi Visit : ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। ঠিক এই আবহেই হঠাৎ দিল্লিমুখী হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরুর দিনেই তাঁর এই সফর রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—ভোটের আগে কি বড় কোনও রাজনৈতিক মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করতে চলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো? নাকি SIR ইস্যুতে কেন্দ্রকে সরাসরি কড়া হুঁশিয়ারি দিতেই এই সফর?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মমতার এই দিল্লি সফর নিছক নিয়মরক্ষার নয়, বরং সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
সংসদের বাজেট অধিবেশনের দিনেই দিল্লি সফর
বুধবার সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার দিনেই দিল্লি যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, হুগলির সিঙ্গুরে জনসভা শেষ করেই রাজধানীর উদ্দেশে রওনা দিতে পারেন তিনি। সংসদের অধিবেশন চলাকালীন সময়ে দিল্লিতে মমতার উপস্থিতি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কারণ, এই মুহূর্তে রাজ্যের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া। এই বিষয়টি নিয়েই কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণ শানিয়ে চলেছে তৃণমূল।
SIR ইস্যুতে বড় প্রতিবাদের ইঙ্গিত
তৃণমূল সূত্রের খবর, এই সফরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দিল্লি যেতে পারেন এমন কিছু পরিবারের সদস্যরা, যাঁদের অভিযোগ—SIR প্রক্রিয়ার চাপেই তাঁদের আপনজন অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন অথবা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে মমতার নেতৃত্বে রাজধানীতে বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচি হতে পারে বলেও জল্পনা তুঙ্গে।
তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির অজুহাতে বিপুল সংখ্যক মানুষকে শুনানিতে তলব করা হচ্ছে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও এই অসঙ্গতির পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। এই বিষয়টিকেই জাতীয় স্তরে সামনে আনতে চাইছে তৃণমূল।
সংসদের সর্বদল বৈঠকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত
মমতার দিল্লি সফরের আগে মঙ্গলবার সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় বৈঠকেও SIR ইস্যুতে তৃণমূলের কড়া অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের উপস্থিতিতে হওয়া ওই বৈঠকে তৃণমূলের দুই সাংসদ সাগরিকা ঘোষ ও শতাব্দী রায় স্পষ্টভাবে দাবি জানান—SIR নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হোক।
তাঁরা অভিযোগ করেন, অসঙ্গতির তালিকা প্রকাশ না করেই সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং শুনানিতে ডেকে হয়রানি করা হচ্ছে। এই ইস্যুতেই সংসদে কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তুলতে প্রস্তুত তৃণমূল।
বিরোধী জোটকে সক্রিয় করার কৌশল?
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মমতার দিল্লি সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হতে পারে বিরোধী জোটকে ফের সক্রিয় করা। লোকসভা ভোটের আগে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে আরও মজবুত করতে অন্যান্য বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন তিনি।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং সংবিধান রক্ষার প্রশ্নে একটি বড় জাতীয় বার্তা দিতে চাইছেন মমতা—এমনটাই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
দিল্লি সফরের প্রভাব পড়ছে রাজ্য বিধানসভাতেও
মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি সফরের প্রভাব পড়েছে রাজ্য বিধানসভার অধিবেশন সূচিতেও। বিধানসভার ‘ভোট অন অ্যাকাউন্ট’ বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল ৩১ জানুয়ারি। রাজ্য বাজেট পেশ হওয়ার কথা ছিল ২ ফেব্রুয়ারি। তবে সেই সূচি বদলেছে।
বিধানসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বাজেট অধিবেশন শুরু হবে ৩ ফেব্রুয়ারি এবং রাজ্য বাজেট পেশ হবে ৫ ফেব্রুয়ারি। মঙ্গলবার বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, কিছু প্রশাসনিক অসুবিধার কারণেই এই তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে।
ভোটের আগে বড় রাজনৈতিক বার্তার প্রস্তুতি?
সব মিলিয়ে, ভোটের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দিল্লি সফর যে নিছক আনুষ্ঠানিক নয়, তা স্পষ্ট। SIR ইস্যুতে কেন্দ্রকে চাপে ফেলা, সাধারণ মানুষের অভিযোগ জাতীয় স্তরে তুলে ধরা, সংসদে সরকারকে কাঠগড়ায় তোলা এবং বিরোধী রাজনীতিকে নতুন করে সক্রিয় করা—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এখন দেখার, রাজধানী থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক কী বার্তা দিয়ে ফেরেন এবং সেই বার্তা ভোটের আগে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।



