Mamata Banerjee Singur News : সিঙ্গুর থেকেই ফের একবার কেন্দ্র সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিশানা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিল্প, কৃষি, ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) থেকে শুরু করে ভাষা, সংস্কৃতি ও বাংলার অধিকার—একাধিক ইস্যুতে সরব হলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সিঙ্গুরবাসীকে আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানালেন, “সিঙ্গুরে শিল্প হবে, কিন্তু কোনও ভাবেই কৃষিজমিতে নয়।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, “ভিক্ষা করব না, রাজ্যের টাকাতেই উন্নয়ন হবে।”
SIR ইস্যুতে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ
গত কয়েক মাস ধরে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল টানাপড়েন চলছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন তাড়াহুড়ো করে এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে এবং বিজেপির নির্দেশে সাধারণ মানুষের উপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এর জেরে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সরকারি আধিকারিকরাও চরম মানসিক চাপে পড়ছেন। এমনকি বিএলও-দের আত্মহত্যা ও অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে বলে তাঁর অভিযোগ।
সিঙ্গুরের সভা থেকে মমতা স্পষ্ট ভাষায় জানান, প্রয়োজনে এই ইস্যুতে আদালতের দ্বারস্থ হবে রাজ্য সরকার। তাঁর কথায়, “মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করব। দিল্লির কানে আমাদের কথা তুলতেই হবে।” একই সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শুনানিতে ডাকলে যান, সহযোগিতা করুন। বাকিটা আমি দেখব।”
মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাসী বার্তা—
“ওরা অহঙ্কার দেখাচ্ছে, ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। সব অহঙ্কার ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেব। আপনারা শুধু পাশে থাকুন।”
প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কটাক্ষ
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী। সিঙ্গুর থেকেই তিনি বলেন, বাংলায় এসে প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, তা সবই নাকি স্ক্রিপ্টেড। টেলিপ্রম্পটার দেখে বক্তব্য রাখেন মোদি—এমন অভিযোগও করেন তিনি। আরও একধাপ এগিয়ে মমতার প্রশ্ন, “হিন্দিতে বাংলা করে লিখে নিয়ে আসেন। বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি কীভাবে বোঝবেন?”
SIR প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“আমি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে চাই—আপনার স্ত্রীর টাইটেল কী? বাংলার মেয়েরা বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি যায়, পদবি পাল্টায়। তাই বলে কি SIR-এর নামে তাদের ডেকে হেনস্থা করা হবে?”
এই ভাষাতেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন তিনি।
উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী
বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আশা ও আইসিডিএস কর্মীদের জন্য মোবাইল ফোন কেনার উদ্দেশ্যে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শস্যবিমা প্রকল্পে কৃষকদের ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এছাড়াও ২৯০টি উদ্বাস্তু কলোনিকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। খাদ্যসাথী, স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকৃত হচ্ছেন, তাও উল্লেখ করেন তিনি।
সিঙ্গুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও শিল্পায়নের বার্তা
সিঙ্গুর প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ৮ একর জমির উপর সিঙ্গুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি হয়েছে। তবে তিনি আবারও স্পষ্ট করে দেন—
“শিল্প হবে, কিন্তু কৃষিজমিতে নয়। কৃষকের জমি কেড়ে কোনও শিল্প নয়।”
তিনি বলেন, রাজ্য নিজের টাকাতেই উন্নয়ন করবে। কেন্দ্রের কাছে হাত পাতবে না। কেন্দ্র সরকারকে আক্রমণ করে মমতার দাবি, “ওরা বলে ধ্রুপদী মর্যাদা দিয়েছে। সব ঝুট। আমরা বাধ্য করেছি বলেই দিয়েছে।”
ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষোভ
ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভও উঠে আসে বক্তব্যে। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলায় কথা বললে রাজস্থান, বিহার বা ওড়িশায় মানুষকে মারধর করা হয়। তবে বাংলায় অন্য ভাষাভাষীদের উপর এমন আচরণ করা হয় না বলেও তিনি দাবি করেন।
মমতার হুঁশিয়ারি,
“আমাকে আঘাত করলে প্রত্যাঘাত হবে। আমি কালবৈশাখী হয়ে যাই, টর্নেডো হয়ে যাই।”
শেষ কথা
সিঙ্গুর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে স্পষ্ট—একদিকে শিল্পায়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে কৃষিজমি রক্ষার বার্তা। পাশাপাশি SIR ইস্যুতে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ের ঘোষণা। সিঙ্গুরবাসীর কাছে হাজারো আশা ও প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন দেখার, কেন্দ্র না রাজ্য—কার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ পায়, সেটাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



