ফুটবলের রাজপুত্র লিওনেল মেসির নামের সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক বরাবরই আবেগে মোড়া। একসময় এই শহরেই আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ে, রাতভর চলে মেসি-ম্যারাডোনা চর্চা। সেই কলকাতাতেই উদ্বোধন হয়েছে মেসির প্রায় সত্তর ফুট উচ্চতার মূর্তি। অথচ সেই কলকাতাকেই যেন নিজের ভারত সফরের স্মৃতি থেকে কার্যত বাদ দিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি—এমনই অভিযোগ উঠছে তাঁর সাম্প্রতিক একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ঘিরে।
ভারত সফরের নানা মুহূর্ত নিয়ে একটি ভিডিও নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন মেসি। সেখানে জায়গা পেয়েছে হায়দরাবাদ, মুম্বই ও দিল্লির বিভিন্ন অনুষ্ঠান, মাঠের ভেতরের আনন্দঘন মুহূর্ত, শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলা, দর্শকদের উদ্দেশে হাত নাড়া—সবই। কিন্তু চোখে পড়ার মতো বিষয় একটাই—কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের অনুষ্ঠান সেখানে কার্যত অনুপস্থিত।
ভিডিওতে আছে সব, নেই শুধু যুবভারতী
মেসির শেয়ার করা ভিডিওতে হায়দরাবাদের অংশে দেখা গিয়েছে তেলঙ্গনার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডির সঙ্গে ফুটবল খেলতে, ছোটদের সঙ্গে মাঠে সময় কাটাতে এবং দর্শকদের উদ্দেশে হাসিমুখে হাত নাড়তে। মুম্বই অংশে রয়েছে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে সচিন তেন্ডুলকরের সঙ্গে কথোপকথনের মুহূর্ত, দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ, এমনকি ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় ‘প্যাডল কাপ’-এ অংশ নেওয়া ও করিনা কাপুর খানের সঙ্গে ছবি তোলার দৃশ্যও।
দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামের ছোট ছোট ঘটনাও ভিডিওতে জায়গা পেয়েছে। সব মিলিয়ে দেখা গিয়েছে এক প্রাণবন্ত, হাসিখুশি মেসিকে—লুইস সুয়ারেজ় ও রদ্রিগো ডি’পলকে সঙ্গে নিয়ে। মাঠের ভেতর ও বাইরের নানা স্মরণীয় মুহূর্ত সাজানো হয়েছে ওই ভিডিওতে।
কিন্তু কলকাতা? যুবভারতী? সেখানে নেই কোনও দৃশ্য।

শুধু মূর্তি, তাও এক ঝলক
কলকাতার প্রসঙ্গে ভিডিওতে একমাত্র যে দৃশ্যটি দেখা গিয়েছে, তা হল মেসির মূর্তি উন্মোচনের মুহূর্ত। কিন্তু যুবভারতী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠান, দর্শকদের উপস্থিতি বা মাঠের কোনও দৃশ্যই রাখা হয়নি। আর এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
অনেকের প্রশ্ন—যে যুবভারতীতে হাজার হাজার দর্শক অপেক্ষা করছিলেন মেসিকে একবার দেখার জন্য, সেই মাঠ কি তাঁর স্মৃতিতে কোনও প্রভাব ফেলেনি? নাকি সেই অভিজ্ঞতাই ছিল এতটাই অস্বস্তিকর যে তিনি তা মনে রাখতেই চাননি?
বিশৃঙ্খলা, অভিযোগ ও দ্রুত প্রস্থান
ঘটনাটি মনে করলে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়। গত শনিবার মেসির অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অনেক আগেই যুবভারতীর গ্যালারি ভরে গিয়েছিল। দর্শকেরা অপেক্ষায় ছিলেন প্রিয় তারকাকে এক নজর দেখার জন্য। কিন্তু মেসি মাঠে পৌঁছানোর পরেই পরিস্থিতি দ্রুত বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
দর্শকদের অভিযোগ, ভিড়ের চাপে তাঁরা মেসিকে ঠিকভাবে দেখতেই পাননি। নিরাপত্তারক্ষীদের ঘেরাও, ছবি তোলার হুড়োহুড়ি—সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। মাত্র প্রায় ২২ মিনিটের মধ্যেই মেসি মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। এরপরেই শুরু হয় ক্ষোভ, ভাঙচুর ও প্রতিবাদ।
এই ঘটনাগুলি শুধু স্থানীয় স্তরে নয়, আর্জেন্টিনার একাধিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশ পায়। ফলে আন্তর্জাতিক স্তরেও কলকাতার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা ছড়ায় বলে মত অনেকের।

সম্মানহানি না কি ভুল ব্যবস্থাপনা?
রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের একাংশের মতে, এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ কলকাতার ভাবমূর্তিকে আঘাত করেছে। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবল তারকার সফর সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে না পারার দায় প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
কেউ কেউ আরও কড়া ভাষায় বলছেন, যুবভারতীর অনুষ্ঠানে যাঁদের সর্বক্ষণ মেসির পাশে দেখা গিয়েছিল, সেই রাজনৈতিক উপস্থিতিই নাকি তাঁকে বিব্রত করেছে। যদিও এই দাবি পুরোপুরি মতামতনির্ভর, তবু সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন মন্তব্যের বন্যা দেখা যাচ্ছে।
আবেগের শহর, বাদ পড়া স্মৃতি
কলকাতা বরাবরই নিজেকে ‘ফুটবলের শহর’ বলে গর্ব করে এসেছে। সেই শহরের নাম যদি বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের স্মৃতিচারণায় কার্যত অনুপস্থিত থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই আঘাত লাগে শহরবাসীর আবেগে।
মেসি ইচ্ছাকৃতভাবেই কলকাতাকে ভুলে গেছেন, নাকি যুবভারতীর অভিজ্ঞতা তাঁর মনে রাখার মতো ছিল না—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর হয়তো কখনওই পাওয়া যাবে না। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাঁর ভিডিও থেকে যুবভারতীর অনুপস্থিতি কলকাতাকে নতুন করে আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ফুটবলের শহর হিসেবে পরিচিত কলকাতার জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অস্বস্তিকর মুহূর্ত—যেখানে গর্ব, আবেগ ও বাস্তবতার সংঘাত স্পষ্ট।



