মেসি সফর ঘিরে বিশৃঙ্খলা, ব্যর্থ আয়োজন ও জনরোষ : লিওনেল মেসির মতো বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ তারকার সফর—এ শুধু একটি ইভেন্ট নয়, বরং একটি শহরের সক্ষমতার পরীক্ষা। কিন্তু শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যা ঘটল, তা সেই পরীক্ষায় কলকাতাকে কার্যত ব্যর্থ প্রমাণ করল। গোটা বিশ্বের নজরে যেখানে কলকাতার গর্বিত ইতিহাস তুলে ধরার সুযোগ ছিল, সেখানে উল্টো ছবি ধরা পড়ল—অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের চরম হতাশা।
🔴 বড় ইভেন্ট সামলাতে অক্ষম কলকাতা?
হাজার হাজার দর্শক বহুদিন ধরে টাকা জমিয়ে টিকিট কেটেছিলেন। কেউ ১০ হাজার, কেউ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে যুবভারতীর গ্যালারিতে বসেছিলেন শুধু একবার চোখের সামনে মেসিকে দেখার আশায়। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের প্রাপ্তি ছিল ক্ষোভ, হতাশা এবং অপমান।
মেসি মাঠে ঢুকলেও সাধারণ দর্শকরা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উপভোগ করতে পারলেন না। অভিযোগ উঠেছে, মাঠে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই মেসিকে কার্যত ঘিরে ফেলেন নেতা-মন্ত্রী, আমলা ও তারকারা। যাঁদের টাকা খরচ করে এই অনুষ্ঠান, তাঁদের জন্য কোনও ব্যবস্থাই রাখা হয়নি।

🔴 নেতা-মন্ত্রীদের ঘিরে রাখা, সাধারণ মানুষ বঞ্চিত
অনেক ভক্তের দাবি, মেসির ইচ্ছে ছিল সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে হাত মেলানো, গ্যালারির দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেই সুযোগই তাঁকে দেওয়া হয়নি। চারদিক থেকে পরিচিত ও প্রভাবশালীদের ভিড় তাঁকে একরকম অবরুদ্ধ করে ফেলে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কিছু ছবিতে দেখা যায়, মেসির পাশে সারাক্ষণ রয়েছেন রাজনৈতিক নেতা ও তারকারা। সেই ছবি দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন দর্শকরা। প্রশ্ন ওঠে—সাধারণ মানুষের টাকা খরচ করে কি শুধু ভিআইপিদের ফটোশুটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল?
🔴 মেসি কি বিরক্ত হয়েই মাঠ ছেড়েছিলেন?
মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যেই মেসিকে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ঘটনাই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক ভক্তের দাবি, এই অগোছালো পরিস্থিতিতে মেসিও বিরক্ত হয়েছিলেন। গ্যালারির দিকে একবার হাত নাড়লেও, পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত মাঠ ছাড়েন তিনি।
ফুটবলবিশ্বের এমন তারকার কাছে এই অভিজ্ঞতা কতটা হতাশাজনক ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—বিশ্বের আর কোনও দেশে কি এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে মেসিকে?
🔴 ক্ষোভে ফেটে পড়া জনতা, যুবভারতীতে তাণ্ডব
মেসিকে দেখতে না পেয়ে দর্শকদের ক্ষোভ রূপ নেয় বিক্ষোভে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের চেয়ার ভাঙা হয়, বোতল ছোড়া হয়, ছিঁড়ে ফেলা হয় ব্যানার ও হোর্ডিং। এমনকি কেউ কেউ ফুলের টব, কার্পেট ও ভাঙা চেয়ার নিয়ে বাড়ি ফেরেন—যা দেখে অনেকের মনে পড়ে যায় প্রতিবেশী দেশের গণঅভ্যুত্থানের সময়কার লুটপাটের ছবি।
পরিস্থিতি এতটাই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে যে মুখ্যমন্ত্রীকেও মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে হয়। পরে প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বাধ্য হন তিনি। এমন নজির সাম্প্রতিক কালে কলকাতার ইতিহাসে বিরল।

🔴 টাকা গেল জলে, রইল অপমান
দর্শকদের একটাই দাবি—টিকিটের পুরো টাকা ফেরত দিতে হবে। অনেকেই বলছেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে।’’ কেউ কেউ তুলনা টানছেন অতীতের বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে। কারও মন্তব্য আরও তীব্র—“মেসিকে দেখতে পেলাম না, কিন্তু কিছু ‘অপরাধী মুখ’ দেখতে হল!”
এই ক্ষোভ শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কলকাতার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এই শহর কি আদৌ বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট সামলানোর মতো প্রস্তুত?
🔴 কলকাতার জন্য লজ্জার দিন?
সব মিলিয়ে মেসির কলকাতা সফর এক ভয়াবহ ব্যর্থতার গল্প হয়ে রইল। যে শহর নিজেকে ফুটবলপ্রেমী শহর বলে পরিচয় দেয়, সেই শহরই কি এমন অপমানের ছবি বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে? এই ঘটনা শুধু আয়োজকদের ব্যর্থতা নয়, বরং কলকাতার ভাবমূর্তির ওপর এক গভীর কালো দাগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্তরে কলকাতার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও প্রশ্নের মুখে পড়বে। আজকের এই দিন অনেকের কাছেই রয়ে যাবে—একটি লজ্জার, কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে।



